ধর্ম

জাহান্নাম থেকে মুক্তির ১০ আমল

প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী আমাদের মৃত্যু অনিবার্য। তবে যার যার আমল অনুযায়ী জান্নাত এবং জাহান্নামের সাথী হবে। এছাড়া পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের কিছু বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এক আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘এটা তো লেলিহান অগ্নি, যা গায়ের চামড়া খসিয়ে দেবে।’ (সুরা মাআরিজ, আয়াত : ১৫-১৬)

মানুষ সৃষ্টিকুলের সেরা জীব হলেও অন্যায়, অনাচার-পাপাচারে লিপ্ত। এতদ্বসত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা মানুষকে সুযোগ দিলেন পাপমুক্ত হওয়ার, তওবা করে সঠিক ফিরে আসারা। এ জন্য তিনি যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল। এরই ধারাবাহিকতায় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাম দুনিয়ায় আগমন করেন। তার আনীত ধর্ম ইসলাম ও আল্লাহর প্রেরিত কিতাব কোরআনে কারিম মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ দেখায়।

আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রত্যেক মানুষের আকাঙ্খা ও চেষ্টা দরকার। নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এমন কিছু সহজ আমল রয়েছে, যা মানুষকে খুব সহজে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ সুগম করে।

আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এক হাজার বছর জাহান্নামকে উত্তপ্ত করা হয়েছে। ফলে তার আগুন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। অতঃপর পুনরায় এক হাজার বছর উত্তাপ দেওয়ার ফলে এটি সাদা রং গ্রহণ করেছে। তারপর আরো এক হাজার বছর উত্তাপ দেওয়ার ফলে এর আগুন কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গেছে। সুতরাং জাহান্নাম এখন সম্পূণরূপে গাঢ় কালো তমসাচ্ছন্ন।’ (তিরমিজি শরিফ)

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জাহান্নামের মধ্যে সেই ব্যক্তির শাস্তি সবচেয়ে হালকা হবে, যার পাদুকাদ্বয় ও জুতার ফিতা হবে আগুনের তৈরি। এর ফলে হাঁড়ির মতো তার মস্তিষ্ক ফুটতে থাকবে। সে মনে করবে, তার শাস্তিই সর্বাপেক্ষা কঠিন। অথচ তার আজাবই সর্বাপেক্ষা হালকা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

জাহান্নামের আগুনের উত্তাপ কখনো প্রশমিত হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তোমরা (আজাব) আস্বাদন করো, আমি তো তোমাদের শাস্তি কেবল বৃদ্ধিই করব।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ৩০)

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যখনই তা (জাহান্নামের আগুন) স্তিমিত হবে তখনই আমি তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯৭)

জাহান্নাম হলো পরলোকের এমন একটি বিশাল এলাকা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন এলাকা নির্ধারিত আছে। সেগুলোকে প্রধানত সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা—

১. নার তথা আগুন। ২. জাহান্নাম তথা আগুনের গর্ত। ৩. জাহিম তথা প্রচণ্ড উত্তপ্ত আগুন।

৪. সায়ির তথা প্রজ্বলিত শিখা। ৫. সাকার তথা ঝলসানো আগুন। ৬. হুতামাহ তথা পিষ্টকারী।

৭. হাবিয়া তথা অতল গহ্বর।

নিম্নে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ১০টি আমল বর্ণনা করা হলো—

১. আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্ভ্রম রক্ষা করে, সে আল্লাহর কাছে এ অধিকার পায় যে তিনি তাকে দোজখ থেকে মুক্ত করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ, সহিহুল জামে, হাদিস : ৬২৪০)

২. আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “আদম সন্তানের মধ্যে প্রত্যেক মানুষকে ৩৬০ গ্রন্থির ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে। (আর প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় সদকা রয়েছে।) সুতরাং যে ব্যক্তি ‘আল্লাহু আকবার’ বলল, ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, ‘সুবহানাল্লাহ’ বলল, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ বলল, মানুষ চলার পথ থেকে পাথর, কাঁটা অথবা হাড় সরাল কিংবা ভালো কাজের আদেশ করল অথবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করল (এবং সব মিলে ৩৬০ সংখ্যক পুণ্যকর্ম করল), সে ওই দিন এমন অবস্থায় সন্ধ্যা যাপন করল যে সে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূর করে নিল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২২০)

৩. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “কেউ যদি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ৩৩ বার, ‘আল্লাহু আকবার’ ৩৩ বার পাঠ করে, এরপর একবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ পাঠ করে, ওই ব্যক্তির সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সাগরের ফেনার সমতুল্য হয়।” (মুসলিম, হাদিস : ১২৩৯)

৪. যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে জান্নাতবাসী হবে। (নাসাঈ : ৫/৩৩৯; সিলসিলাহ সহিহাহ : ৯৭২)

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচ, যদিও খেজুরের এক টুকরো সদকাহ করে হয়। আর যে ব্যক্তি এর সামর্থ্য রাখে না, সে যেন ভালো কথা বলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪১৩)

৬. হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘কোনো ব্যক্তি যদি জান্নাতের জন্য আল্লাহর কাছে তিনবার প্রার্থনা করে, তাহলে জান্নাত তখন বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর কোনো ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইলে জাহান্নাম তখন আল্লাহর কাছে বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৭২)

৭. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে জোহরের আগে চার রাকাত ও পরে চার রাকাত নামাজ আদায় করবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১১৬০, আবু দাউদ, হাদিস : ১২৬৯)

৮. আবু বকর ইবনে শায়বা, আবু কুরায়ব ও ইসহাক ইবনে ইবরাহিম (রহ.)… আবু বকর ইবনে উমর ইবনে রুয়াইবা (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের আগে অর্থাৎ ফজর ও আসরের সালাত আদায় করে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। তখন বসরার এক ব্যক্তি তাঁকে বলেন, আপনি কি এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছেন? তিনি বলেন হ্যাঁ। তখন ওই ব্যক্তি বলল, আমি এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নিজ কানে তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছি এবং আমার হৃদয়ে তা গেঁথে রেখেছি। (মুসলিম, হাদিস : ১৩১১)

৯. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে উপস্থিত হবে যে তার ওপর জাহান্নাম হারাম।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৪৬৮২)

১০. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম?

যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়), সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী (তার জন্য জাহান্নাম হারাম)।’(তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৮)

কিছু আমলের কথা উল্লেখ করা হলো-

গীবতমুক্ত জীবনযাপন করা

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করে, কিয়ামতের দিবসে আল্লাহতায়ালা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।’ –সুনানে তিরমিজি: ১৯৩১

দৈনিক ৩৬০ বার তাসবিহ-তাহলিল ও তাকবির আদায় করা
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক আদম সন্তানকেই ৩৬০টি গ্রন্থির ওপর সৃষ্টি করেছেন (আর প্রতিটি গ্রন্থির কিছু সদকা রয়েছে)। সুতরাং যে ব্যক্তি ওই সংখ্যা পরিমাণ ‘আল্লাহু আকবার’ বলল, ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলল, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, ‘সুবহানাল্লাহ’ বলল, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলল, মানুষের চলার পথ থেকে পাথর, কাঁটা অথবা একটি হাড় সরাল, ভালো কাজের আদেশ করল কিংবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করল (এবং সব মিলে ৩৬০ সংখ্যক পুণ্যময় কাজ করল), সে ওই দিন এমতাবস্থায় সন্ধ্যা যাপন করল, সে নিজেকে জাহান্নাম থেকে দূরে করে নিলো। -সহিহ মুসলিম: ২২২০

চল্লিশ দিন তাকবিরে উলার সঙ্গে নামাজ আদায় করা
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে একাধারে চল্লিশ দিন তাকবিরে উলার (প্রথম তাকবির) সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করবে আল্লাহতায়ালা তাকে দু’টি জিনিস থেকে মুক্তি দেবেন। ১. জাহান্নাম হতে মুক্তি ও ২. মুনাফিকি হতে মুক্তি। -সুনানে তিরমিজি: ২৪১

বেশি বেশি দান করা
সাহাবি হজরত আদি ইবনে হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী কারিম (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো যদিও এক টুকরো খেজুর সদকা করে হয়।’ –সহিহ বোখারি: ১৪১৭

জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি চেয়ে দোয়া করা
আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহতায়ালার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত তখন বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জাহান্নাম হতে মুক্তি চায়, জাহান্নাম তখন আল্লাহতায়ালার কাছে বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন। -সুনানে তিরমিজি: ২৫৭২

জোহরের ফরজ নামাজের পূর্বে এবং পরে চার রাকাত নামাজ আদায় করা
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জোহরের আগে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত নামাজ আদায় করবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন। -ইবনে মাজাহ: ১১৬০

মানুষের সঙ্গে মধুময় আচরণ
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না কোনো ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোনো ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়) সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী। -সুনানে তিরমিজি: ২৪৮৮

চোখকে গোনাহ থেকে হেফাজত করা
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, জাহান্নামের আগুন দু’টি চোখকে স্পর্শ করবে না- ১. আল্লাহতায়ালার ভয়ে যে চোখ ক্রন্দন করে। ২. আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ পাহারা দিয়ে রাত পার করে। -সুনানে তিরমিজি: ১৬৩৯

ফরজ রোজার পাশাপাশি বেশি বেশি নফল রোজা রাখা
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রোজা (জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য) ঢালস্বরূপ।’ –সহিহ বোখারি: ১৮৯৪

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহতায়ালা ওই এক দিনের বিনিময়ে তার থেকে জাহান্নামকে ৭০ বছর (পরিমাণ পথ) দূরে রাখবেন। -সহিহ বোখারি: ২৮৪০

কন্যাসন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করা
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ভিখারিণী দু’টি কন্যা সঙ্গে করে আমার কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চাইল। আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া আর কিছু ছিলো না। আমি তাকে তা দিয়ে দিলাম। খেজুরটি সে দু’ভাগ করে কন্যা দু’টিকে দিয়ে দিলো। তা থেকে সে নিজে কিছুই খেল না। এরপর সে উঠে বের হয়ে গেল। তারপর নবী করিম (সা.) আমাদের কাছে এলে তার কাছে ওই ঘটনা শোনালাম। ঘটনা শুনে তিনি বললেন, যে ব্যক্তি একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে এবং সে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। সে কন্যাসন্তান তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে অন্তরাল (পর্দা) হবে। -সহিহ বোখারি: ১৪১৮

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button