ধুনট উপজেলাপ্রধান খবর

প্রায় ২৩ বছর পর নেপাল থেকে বগুড়া নিজ বাড়িতে নিখোঁজ আমেনা

বগুড়ার ধুনটের চিকাশী ইউনিয়নের ছোট চাপড়া গ্রামের আমেনা খাতুন (৮০) ১৯৯৮ সালে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকে সবার কাছে ‘মৃত’ ছিলেন তিনি। সন্তানরাও ভাবছিলেন আর কখনও মায়ের দেখা পাবেন না। সেই আমেনা ২৩ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন।

৬ সেপ্টেম্বর সোমবার আমেনাকে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বিকেল ৫টায় বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দেন তার ছেলে-নাতিরা। তিনি নেপাল থেকে ফিরেছেন। এদিকে এলাকাবাসীসহ স্বজনরা আমেনাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করছেন বাড়িতে।

সোমবার দুপুর ১টায় নেপালের একটি বিশেষ প্লেনে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন আমেনা। সরকারি সহযোগিতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানিয়েছেন আমেনার নাতি আদিলুর রহমান আদিল।

তার নাতি আদিল জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তার দাদি মানসিক ভারসাম্যহীন। এর আগে তিনি সুস্থ ছিলেন। তিন ছেলে আমজাদ হোসেন, ফটিক মিয়া ও ফরাজুল হক জন্মের পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর মেয়ে আম্বিয়ার জন্ম হয়। তার এক ছেলে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী মাজবাড়ী গ্রামে এবং আর এর এক ছেলে নন্দিগ্রাম উপজেলার বীরফটিগ্রামে থাকে। তিনি বর্তমানে বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের বাসায় এসে উঠেছেন।

১৯৯৮ সালে ফটিক মিয়া সৌদি আরবে চলে যান। সেইদিন একই সময়ে মা আমেনা খাতুনও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই নিখোঁজ তিনি। সবাই ধরেই নিয়েছিল তিনি মারা গেছেন।

আদিল জানান, গেল রোজার ঈদের আগে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যরা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমেনা খাতুন নেপালে রয়েছেন বলে খোঁজ দেন। তারা ছবি দেখালে আমেনা খাতুনের পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবার।

এরপর ৩ সেপ্টেম্বর নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মাসুদ আলম সন্তানদের সঙ্গে আমেনার ভিডিও কলে কথা বলার ব্যবস্থা করেন। ভিডিও কলে তিনি সন্তানদের-স্বজনদের চিনতে পারেন।

এ ঘটনায় মাসুদ আলম ৪ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেন, নেপালে ২৩ বছর পর মায়ের সন্ধান পেলেন বগুড়ার আমজাদ হোসেন। ২৩ বছর আগে ধুনটের আমেনা খাতুন বাড়ি থেকে অভিমান করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তার বয়স এখন প্রায় ৮০ বছর। তার বড় ছেলে আমজাদের বয়স ৬০ বছর। মাসুদ আলমের স্ট্যাটাস ও উদ্যোগের কারণেই আমেনার সন্ধান পায় পরিবার।

মাসুদ ফেসবুকে আরও বলেন, গত ৩০ মে নেপালের সুনসারি জেলার কুইক রেসপন্স সেন্টার ইনারোয়া সুনসারি এর মুকেশ মেহতা তার ফেসবুকে ইনারোয়া পৌরসভার ডেপুটি মেয়র যমুনা গৌতম পোখরেলের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের একজন নারী রয়েছেন উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন। এতে নেপাল বাংলাদেশ ইয়্যুথ কনক্লেভের চেয়ারম্যান অভিনাভ চৌধুরী আমাকে কমেন্টসে মেনশন করেন। এরপর আমিনার সঙ্গে কথা বলে ঠিকানা জানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। পরে রাষ্ট্রদূতের পরামর্শে ১ জুন কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে সুনসারিতে যাই। সে সময়ে নেপাল জুড়ে লকডাউন এবং কোভিড আক্রান্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ইনারোয়াতে আমাকে সহায়তা করেন সুনসারি বাঙালি সমাজের সভাপতি বিপ্লব ঘোষ। ‘দীর্ঘ সময় আমেনা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে তার ঠিকানা উদ্ধার করে বগুড়া জেলা অফিসের প্রচেষ্টায় ঠিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত হই। আমেনার বাকি জীবন তার পরিবারের সঙ্গে আনন্দে কাটুক এ প্রত্যাশা করি।’

আদিল বলেন, ‘দাদিকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আমার বাবা, চাচাসহ সবাই ঢাকা যাই। এরপর দাদিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরি । এটি আমাদের পরিবারের জন্য অনেক খুশির খবর। ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

তবে কীভাবে তিনি নেপালে গেলেন, সে বিষয় কেউ জানাতে পারেননি। তবে নেপালে এক নারীর আশ্রয়ে ছিলেন বলে জানা গেছে।

তার ছেলে মেয়েরা জানান, তারা দীর্ঘদিন তাদের মাকে খোঁজাখুজি করে না পাওয়ার তারা ভেবেই নিয়েছিল তাদের মা মারা গেছেন। ছেলে মেয়েদের জাতীয় পরিচয় পত্রেও তার মায়ের নামের পূর্বে মৃত লেখা আছে। তারা যখন খবর পায় তাদের মা বেঁচে আছেন, জানার পর সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

তারা আরও জানান, আমেনা খাতুনকে দেশে আনতে প্লেন ভাড়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও যারা তাদের মাকে ফিরে আনতে সহয়তা করেছেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।

বগুড়া এনএসআইয়ের উপ-পরিচালক মুজাহারুল ইসলাম মামুন বলেন, ‘নেপালে বাংলাদেশি দূতাবাসের কনস্যুলার মাসুদ আলমের তথ্য পেয়ে আমরা ওই নারীর ঠিকানা খুঁজে বের করি। মাসুদের দক্ষতা ও বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিকতার কারণেই ওই নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলম সোমবার দুপুরে একটি বিশেষ ফ্লাইটে আমেনা খাতুনকে নিয়ে দেশে ফেরেন। এর আগে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমেনাকে বিদায় জানান সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button