ধর্ম

আজ শুভ জন্মাষ্টমী

আজ (৩০ আগস্ট) শুভ জন্মাষ্টমী। ভগবান শ্রী কৃষ্ণের শুভ জন্মদিন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে আনন্দঘন এই দিনটি উদযাপিত হয় নানা আয়োজনে। কিন্তু এবারও মহামারি করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে বন্ধ করা হয়েছে জন্মাষ্টমীর প্রধান আকর্ষণ। তাই এবারও হচ্ছে না উৎসবমুখর বর্ণাঢ্য র‌্যালি। গেল বছরও করোনা সংক্রমণের কারণে জন্মাষ্টমীর র্যা লি অনুষ্ঠিত হয়নি। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সারা দেশে এই সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিয়েছে। তাই এবার শুধু পূজা আর কল্যাণ কামনায় ধর্মীয় নানা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে শুভ জন্মাষ্টমী।

শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষীয় অষ্টমী তিথিতে সনাতন হিন্দু ধর্ম মতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মদিন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি অত্যন্ত উৎসব-আনন্দ ও শুভময়। হাজার বছর ধরে জন্মাষ্টমীকে সনাতন ধর্মের মানুষ অত্যান্ত উৎসবমুখর ও পবিত্রতায় উদযাপন করে থাকেন।

মহামারি করোনার কারণে এবার জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা বের না হলেও বাংলাদেশে ঐতিহ্য আছে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার। ঢাকায় কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে জন্মাষ্টমীর বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও শিশুরা নতুন ও পরিচ্ছন্ন পোশাকে বের হন। শিশু ও নারীরাও উৎসবের সাজে সাজিয়ে নেয় নিজেকে।

জন্মাষ্টমীতে আনন্দ শোভাযাত্রার ঐতিহ্য আছে ঢাকার। ১৯৫৫ সালে রাধাষ্টমীর সময় পুরান ঢাকার বংশাল এলাকায় পিরু মুন্সীর পুকুরপাড় থেকে জন্মাষ্টমীর একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের হতো। পরবর্তীতে নববাপুরের লক্ষীনারায়ণ মন্দির থেকে কৃষ্ণদাসের নেতৃত্বেও আরো সুদৃশ্য শোভাযাত্রা বের হতো। মিছিলে অনেকেই গোপ ও ব্রজবাসী সেজে র্যা লিতে যোগ দিতেন। খোল-কর্তাল আর হরিনাম শ্লোগানে উৎসব মুখর হতো আশপাশের এলাকা। মিছিলে পতাকা, নিশান, বল্লম প্রদর্শিত হতো।

এরপর পুরনো ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ মন্দির থেকে জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা বের করতেন। ঢাকায় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা এতই বর্ণাঢ্য ও উৎসবমুখর হতে যে দূর দূরান্তের গ্রাম থেকেও মানুষ আসত এই উৎসবে যোগ দিতে। সে সময় কলকাতা থেকেও জন্মাষ্টমীর উৎসবে যোগ দিতে ঢাকায় আসতেন অনেকেই। সার্বজনীন এই আনন্দ উৎসবে যোগ দিতেন মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও। বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচ ও নদী পাড়ে মেলাও বসতো জন্মাষ্টমীর উৎসবে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরও দু’বছর নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে ঢাকায় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা বের হয়। কিন্তু ১৯৫০ সাল থেকে দাঙ্গা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকায় জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দেশ পরিচালনার সময়ে দীর্ঘ ৩৯ বছর পর ১৯৮৯ সালে আবারো জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয় ঢাকায়। মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সার্বিক সহায়তা ছিল জন্মাষ্টমীর আনন্দ শোভাযাত্রা সাফল ও নিরাপদ করতে। দেয়া হয় আর্থিক সহায়তাও।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আনুগত্য এবং জন্মাষ্টমীর উৎসব আনন্দে হিন্দু সম্প্রদায়ের গভীর অনুরাগের কথা বিবেচনা করে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জন্মাষ্টমীর দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। যাতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনটি উৎসবমুখর আয়োজনে উদযাপন করতে পারেন। একটু সময় নিয়েই করতে পারেন পূজা-অর্চনা।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জন্মাষ্টমীর দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণার পর থেকে জন্মাষ্টমীর উৎসব আয়োজন আরো বর্ণিল হতে থাকে। সরকারি ছুটির কারণে জন্মাষ্টমীর আয়োজনে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও যোগ দিতে পারেন অনায়াসে।

উৎসবে বর্ণিল এই দিনটি আয়োজন ও উদযাপনের বিষয়ে সরকারি কোনো উদ্যোগ ছিল না। কারো ভাবনাতেই ছিল না সনাতন ধর্মের এমন পবিত্র ও উৎসবমুখর একটি আনন্দঘন দিনকে সরকারি ছুটি ঘোষণার। কেবল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্মাষ্টমীর উৎসবে ছুটির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন। তাই বাংলাদেশে জন্মাষ্টমীর উৎসবের সাথে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবদান আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু জন্মাষ্টমীতে সরকারি ছুটিই নয়, ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে হিন্দুধর্ম কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টে এখন অন্তত ১শ কোটি টাকা মজুদ আছে। পাশাপাশি নরায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে পূণ্যজ্ঞানের জন্য ঐতিহাসিক ঘাট নির্মাণ করে পল্লীবন্ধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভালোবাসা অর্জন করেন। চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দেশ পরিচালনার সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসনে সনাতন ধর্মের অনেক বড় বড় কর্মকর্তারা এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০১৯ সালের ১৪ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে গেছেন সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চল্লিশা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৩ জুলাই ছিল শুভ জন্মাষ্টমী। তাই জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জনবন্ধু গোলাম কাদের এমপি জন্মাষ্টমীর প্রতি সম্মান জানিয়ে ২৩ আগস্টের পরিবর্তে ৩১ আগস্ট পল্লীবন্ধুর চল্লিশা উপলক্ষ্যে দোয়া-মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করেন। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জনবন্ধু গোলাম মোহাম্মদ কাদেদের এমন সিদ্ধান্ত শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, সকল ধর্মাবলম্বীর কাছেই প্রশংসিত হয়েছে।

এবারও শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন জাতীয় পার্টি চেয়াম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জনবন্ধু গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি। এ বছর বাণীতে গোলাম মোহাম্মদ কাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনের সকল আয়োজন সফল, সুন্দর ও আনন্দঘন হবে। জন্মাষ্টমীর এই শুভলগ্নে বিশ্ব শান্তি, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব কামনা করে তিনি বলেন, আগামী দিনে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরো সুদৃঢ় হবে। গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, পৃথিবীর সকল ধর্মই সাম্য, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব আর ভালোবাসার কথা বলেছে। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য দৃঢ়ভাবে রক্ষা করবে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেয়া বাণীতে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান আরো আশা প্রকাশ করে বলেন, করোনাকালে জন্মাষ্টমীর প্রতিটি আয়োজন যেন সামাজিক ও শারিরিক দূরত্ব বজায় রেখে উদযাপিত হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যেন সবাই ধর্মীয় বিধি বিধান অনুসরণ করেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মের মানুষের অসীম কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। ১৯৮৮ সালে জন্মাষ্টমীর দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনন্য উপহার দিয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ প্রসঙ্গে নির্মল কুমার চ্যাটাজী আরো বলেন, এরশাদ সাহেবই সরকারি চাকরিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছেন। তার জন্যই এখন বাংলাদেশে সনাতন ধর্মের অনেক মেধাবী সন্তান দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায় এ প্রসঙ্গে বলেন, পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনেতা। কোনো ধর্মের প্রতি তার বৈষম্য ছিল না, সবাইকে একই চোখে দেখেছেন পল্লীবন্ধু। শুধু মসজিদের নয় পল্লীবন্ধু মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডাসহ সকল উপসনালয়ের পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক সুজন দে বলেন, পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দারুণ অনুরাগ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি। আর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরাও হিন্দু সম্প্রদায়ের সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বিদের কাছে জাতীয় পার্টি অত্যন্ত আস্থার রাজনৈতিক সংগঠন।

জাতীয় পার্টির নির্বাহী সদস্য ঝুটন দত্ত বলেন, পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আদর্শ সকল ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। পল্লীবন্ধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পল্লীবন্ধু অসংখ্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। 

লেখক: খন্দকার দেলোয়ার জালালী (সাংবাদিক ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি- ০২।)

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button