বগুড়া জেলা

করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষিকার পাশে দাঁড়ালেন বগুড়া জেলা পুলিশ

বগুড়ায় করোনায় স্বামী হারিয়ে চাকরি খোয়ানো শিক্ষিকা মায়িশা ও তার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে বগুড়া জেলা পুলিশ। তারা করোনাকালে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জেলার নবাগত পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বিপিএম-সেবা সাবেক ঐ শিক্ষিকা মায়িশার হাতে নগদ অর্থ উপহার ও তার পরিবারের সকল সদস্যদের নতুন কাপড় উপহার হিসেবে দেন।

দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোতে ” করোনায় স্বামী হারিয়ে শিক্ষিকা মায়িশা এখন পরিচ্ছন্নতাকর্মী” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতে ভাইরাল হলে জেলার নবাগত পুলিশ সুপারের দৃষ্টিতে আসে৷ পরে তিনি দ্রুত সাবেক শিক্ষিকা মায়িশা ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ান।

ওই সময় নবাগত পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বিপিএম -সেবা বলেন, আমরা জীবন বাজি রেখে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ চালাচ্ছি। পাশাপাশি পুলিশ সামাজিক দায়িত্ব থেকেও এই যুদ্ধে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করে চলেছে। আপনাদের সাংবাদের মাধ্যমে এই মর্মান্তিক বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। একজন শিক্ষকের মেয়ে ও শিক্ষকের এই পরিণতি আমরা হতে দিতে পারিনা। তাই প্রাথমিকাভাবে মায়িশার পরিবারকে আমরা নগদ অর্থ উপহার দিয়েছি। পাশাপাশি তাদের সবরকম দায়িত্ব জেলা পুলিশ গ্রহণ করেছে। আমরা চেষ্টা করছি যেহুতু মায়িশা শিক্ষিত তাই তার যোগ্যতা অনুযায়ী কোন চাকরি দেওয়া যায়। যেন তার আর পিছে ফিরে তাকাতে না হয়।

জানা যায়, বগুড়া শহরের নাটাইপাড়া এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করতে মায়িশা ফারহা (২৪)। ছোট থেকে নিজের জন্ম পরিচয় না জানা মায়িশাকে দত্তক নেন বগুড়ার এক দম্পতি। পরে তারা তাকে নিজের মেয়ের মতোন করে বড় করেন। একপর্যায়ে মায়িশার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে নঁওগা জেলার মৃত মতিউর রহমানের। সেখান থেকে পরিণয় হয় তাদের। মৃত মতিউর পেশায় একজন বীমা কর্মকর্তা ছিলেন। সব মিলিয়ে ভালো কাঁটছিল মতিউর মায়িশা দম্পতির। এর মাঝে দুটি কন্যা সন্তানও জন্ম হয় তাদের। যাদের বর্তমান বয়স পাঁচ ও আড়াই বছর। হটাৎ করোনার থাবায় চাকরি হারান মতিউর ও মায়িশা। এরপর মতিউর চক্ষুলজ্জা ছেড়ে শুরু করেন অটো রিকশা চালানো। তবে এই বছর জানুয়ারি মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনিও।

এদিকে দত্তক নেওয়া বৃদ্ধ বাবা-মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পরেন মায়িশা। সন্তানদের দুধের টাকা জোগাতে একপর্যায়ে শুরু করেন ভিক্ষাবৃত্তিও।

এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও বগুড়ার সিনিয়র এক সাংবাদিকের চোখে আসলে তিনি মায়িশার সাথে যোগাযোগ করে জেলার একটি বড় গ্রুপ অব কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে দেন। মায়িশা গত এক সপ্তাহ হলো সেখানে পরিছন্নতাকর্মীর সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন।

জেলার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে মায়িশার দত্তক নেওয়া বাবা রুস্তম আলী বলেন, ‘আমরা এসপি স্যারকে দোয়া দিয়ে শেষ করতে পারবো না। মনে হচ্ছে আমি ও আমার স্ত্রী মারা গেলেও আমার মেয়ে ও নাতনির জন্য এখন একজন অভিভাবক আছেন বড় ভাই আছেন। আল্লাহ স্যারকে দীর্ঘজীবী করুন। উনি নিজে আমাদের গাড়ি পাঠিয়ে ডেকে এনে সব দায়িত্ব নিয়েছেন ও সহযোগিতা করেছেন। আমার এই কষ্ট ও আজকের প্রাপ্তি ভাষায় বুঝাতে পারবো না।’

আনন্দে আত্মহারা মায়িশা জানান, ‘এসপি স্যার দেবদূতের মতো আমাদের পাশে দাঁড়ালেন। পাশাপাশি সাংবাদিক ভাই ও আমি যে কোম্পানিতে কাজ করি সেই কোম্পানির মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমি কোন সহযোগীতা চাইনা। আমি কাজ চাই। যেন আমার দুই বাচ্চা ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি প্রকাশের পরে জেলা পুলিশের পাশাপাশি ফ্রেশ গ্রুপ থেকে তাকে বিকাশে ১০ হাজার টাকা উপহার পাঠিয়েছে।’

এছাড়াও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জেলা পুলিশের পাশাপাশি মায়িশার পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী উপহার দেন রাজাবাজার আড়ৎ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ।

মায়িশা ও তার পরিবারকে উপহার প্রাদানের সময় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী,(অপরাধ) আব্দুর রশিদ, (ডিএসবি) মোতাহার হোসেন, (সদর হেডকোয়ার্টার) হেলেনা আক্তার ও সদর থানার ওসি তদন্ত আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button