জাতীয়

ইসরাইলী হামলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিরব কেন: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলাকে ‘অমানবিক’ আখ্যায়িত করে পুনরায় এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং এই ইস্যুতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কথা না বলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘প্যালেষ্টাইনে যে ঘটনা ঘটেছে তা সত্যই অমানবিক। সেই ছোট্ট শিশুর কান্না এবং তাঁদের সেই অসহায়ত্ব, মাতা-পিতা হারিয়ে ঘুরে বেড়ানো- এটা সহ্য করা যায়না।’ তিনি বলেন,‘ যারা মানবতার এত কথা বলেন এ সময় তাদের অনেকেই চুপ কেন, আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা এখন আর কথা বলেনা কেন, সেটাই আমার প্রশ্ন। ’

প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা আজ সন্ধ্যায় একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ (২০২১ সালের বাজেট অধিবেশন) অধিবেশনে বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এবং সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মতিন খসরু এবং আসলামুল হক আসলাম সহ ১১ জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে গৃহীত শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় এ কথা বলেন। এ সময় স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসরাইল এর আগেও হামলা চালিয়েছে। আমরা এই হত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানাই এবং যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
তিনি বলেন, এই যে হামলায় ছোট ছোট শিশুরা আহত হচ্ছে, অত্যাচারিত হচ্ছে তাঁদের ওপর এই যে জুলুম এটা সহ্য করা যায়না।
প্রধানমন্ত্রী নির্যাতিত প্যালেষ্টাইনবাসীকে আশ^স্থ করে বলেন,‘যাহোক আমরা আমাদের প্যালেস্টাইনি ভাইদের সঙ্গে সবসময়ই আছি, অতীতেও সবরকমের সহযোগিতা আমরা করেছি, এখনও করছি এবং ভবিষ্যতেও অবশ্যই করে যাব।’

এর আগে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, একেএম রহমতউল্লাহ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, মুজিবুল হক, মো.আলী আশরাফ, সাদেক খান শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

এ ছাড়াও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের, চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা, জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ, ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং বিএনপি’র সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

পরে সংসদে সর্বসস্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং নিহতদের বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন শেষে বিশেষ মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। এরপরেই রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদের দিনের অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত করে সংসদ মূলতবী করা হয়। অবশ্য এরআগেই এদিন প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।

শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে করোনার দ্বিতীয় আঘাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করার লক্ষ্যে গৃহীত সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে দেশবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান পুনর্ব্যক্ত করেন।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর থেকে একে নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য তাঁর সরকার সবরকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, তবে বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ আবার এই করোনা দেখা দেওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, আমি সবাইকে বলবো সকলে যেন আমাদের স্বাস্থ্যবিধিটা মেনে চলেন। বাংলাদেশের সব মানুষের প্রতি আমার এই একটা আহবান থাকবে।

তিনি বলেন, তাঁর সরকার টিকাদান থেকে শুরু করে সবরকম সুরক্ষার ব্যবস্থা নিলেও নিজেকে নিজের সুরক্ষিত রাখতে হবে। এদিন যাঁদের মৃত্যুতে সংসদে আরো শোক জানানো হয় তাঁরা হচ্ছেন- সাবেক মন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য ও অভিনেত্রী সারা বেগম কবরী, মেরাজ উদ্দিন মোল্লা, গাজী এমএম আমজাদ হোসেন, মোহাম্মদ ইউনুস, জিয়াউর রহমান খান, আব্দুল বারী সর্দার, দিলদার হোসেন সেলিম, আব্দুর রউফ খান ও ফরিদা রহমান, সাবেক গণপরিষদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ এবং আবুল হাশেম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে খুনীদের বিচারের হাত থেকে রেহাই দিয়ে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরী দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু তিনি এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে রিফিউজি হিসেবে বিদেশে অবস্থান করলেও দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বা রেহানা বা ১৫ আগষ্টের অন্য শহিদ পরিবারের সদস্যদের এই হত্যার বিচার চাওয়ার কোন অধিকার ছিলনা। কিন্তু ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকার এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সটি বাতিল করে। বিলটি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন সে সময়ের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু।

সেদিনের অধিবেশনে মতিন খসরু যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাআজও তাঁর কানে বাজে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মতিন খসরুকে প্রথমে প্রতিমন্ত্রী এবং পর মন্ত্রির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মী। ছাত্রলীগ, যুবলীগ করা এই মতিন খসরুকে পরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যও করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ এর চলমান অবস্থায় তাঁকে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির পদে মনোনয়ন দিলেও বেশি ঘোরাঘুরি না করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর মধ্যে জেতার প্রচন্ড আগ্রহ থাকায় সারা বাংলাদেশ তিনি সফর করেন এবং করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।
প্রতিদিন তাঁর স্বাস্থ্যের খবর নিলেও তাঁকে বাঁচানো গেলনা।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। আসলামুল হক সম্পর্কে প্রধামন্ত্রী বলেন, তিনিও আমাদের নিবেদিত প্রাণ একজন কর্মী ছিলেন। সকল আন্দোলন-সংগ্রামেই সবসময় অগ্রণী ভ’মিকা নিয়েছেন। খুব জনপ্রিয় ছিলেন । সেকারণে বারবাার নির্বাচিতও হয়েছেন। এলাকার মানুষের প্রতি তাঁর একটা আলাদা দরদ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

তিনি সারা বেগম কবরী, মেরাজ মোল্লা, সিরাজগঞ্জের আমজাদ হোসেন মিলন, ফরিদা রহমানের মৃত্যুতেও গভীর শোক প্রকাশ করেন। বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান খান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার নিজের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়াচীন- বই প্রকাশে আমরা একসাথে কাজ করেছি। তিনি সহ বেবী মওদুদ আমরা যাঁরা একসঙ্গে কাজ করতাম একে একে সবাইকে হারালাম। জাতির পিতার স্মৃতিকথা বইটির কাজও তিনি অনেকদূর শেষ করে গেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বই প্রকাশে শামসুজ্জামান খান সবসময় পরামর্শ দিতেন এবং সংশোধণের কাজটিও নিজহাতে করতেন। শেখ হাসিনা বলেন, সংশোধনের জন্য তাঁদের আলাদা আলাদা কলম ছিল, যেমন শামসুজ্জামান সাহেবের ছিল লাল কলম। সেই কলম ব্যবহার তাঁরা যে যখন পারতেন সংশোধনীর কাজ করতেন। এই বইগুলো প্রকাশে তাঁর (শামসুজ্জমান খান)যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শামসুজ্জামান খান বাংলা একাডেমীর উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। একে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলায় তিনি কাজ করে গেছেন।কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজিও বাংলা একাডেমীর জন্য অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য পর পর দুজনই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এটা সত্যিই খুব দু:খজনক। এভাবে আমরা এক একজনকে হারাচ্ছি।

সংসদে ২০২১-২২ সালের বাজেট অধিবেশনের এই সময় শোকপ্রস্তাবে দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্য তিনি পুণরায় দু:খ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বিচার চাওয়ার কোন অধিকার ছিলনা। সেই অধিকার আমাদের ফিরিয়ে দিতে মতিন খসরু অনেক কষ্ট করেছেন। মামলা পরিচালনায় দিন রাত যে পরিশ্রম করেছেন সেজন্য তিনিসহ সংশ্লিস্টদের প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি দেখেছি তাঁর ভেতর (মতিন খসরু) সবসময় একটা শক্তি ছিল। কারণ মামলা করা অত সহজ ছিলনা, অনেক বাধা ছিল। কিন্তু তারপরও তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন। সেকথা আমি সবসময় স্মরণ করি এবং তাঁর জন্য দোয়া করি

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button