সারাদেশ

রাজশাহী বিভাগে করোনায় চারদিনে ৩২ মৃত্যু, শনাক্তের হার ৫২.৫ শতাংশ

রাজশাহীতে করোনা শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.৫ শতাংশে। সেই সাথে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে। এমন অবস্থায় ভয়াবহ পথের দিকে এগোচ্ছে রাজশাহী বিভাগ। বাড়ছে করোনা শনাক্তের হার ও মৃত্যু সংখ্যাও। তাই রাজশাহীতে প্রশাসনকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আরো কঠোরতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তার সঠিক বাস্তবায়ন চান বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুক্রবার ২৮ মে দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে তারা মারা যান।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত ২৪ মে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিলো। আর শুক্রবার ২৮ মে পর্যন্ত এই চারদিনে করোনা ও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। এই ৩২ জনের মৃত্যু নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরাও। জানা গেছে, সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রাজশাহী জেলা ও রাজশাহীর পার্শ্ববর্তী জেলা চাঁপাইনবাগঞ্জ। সংক্রমণের সাথে সাথে এই দুই জেলায় মৃত্যুও সবচেয়ে বেশি। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১০ জন মারা গেছেন তাদের মধ্যে চারজনের করোনা পজিটিভ। বাকি ছয়জনের করোনা উপসর্গ ছিল। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার আগেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।

নিহতদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচজন, রাজশাহীর তিনজন, নাটোরের একজন ও কুষ্টিয়ার একজন। মৃতরা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শীর্ষ মোহাম্মদ, লুৎফর রহমান, লাল মোহাম্মদ, গোলেসা বিবি ও নজরুল ইসলাম। আর রাজশাহী নগরীর শরিফ হোসেন, হুমায়ুন কবির ও বাগমারার আব্দুর রহমান এবং নাটোরের মোহনপুর এলাকার আবুল কাশেম। ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিউতে মোট ১৭৭ জন করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদের মধ্যে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৭১ জন। এদের মধ্যে আইসিইউতে ভর্তি আছেন ১৩ জন।

রামেক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ জানান, কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারো করোনা আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বেড়েছে। সাথে মৃত্যুর সংখ্যাও। এটা পরিস্থিতি খারাপের লক্ষণ। করেনায় আক্রান্তদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চললে সমস্যা আরো প্রকট হতে পারে। তারা জানান, এখনো চাঁপাইনবাগঞ্জের অনেক মানুষ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন জায়গা দিয়ে রাজশাহী শহরে আসছে। এই বিষয়টির প্রতি কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সংক্রমণ না কমা পর্যন্ত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজশাহীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে নিশ্চিত করার ব্যাপারেও বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ১০ শতাংশ বেড়ে শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.৫ শতাংশে। শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার রাজশাহী জেলার ১১৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রামেক হাসপাতালের পৃথক পিসিআর ল্যাবে জেলার ২১৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। গত তিনদিনের করোনার নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, মঙ্গলবার রাজশাহী জেলার করোনা শনাক্তের হার ছিল ২১.৭ শতাংশ। সেটি বুধবার দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ শতাংশে। আর বৃহস্পতিবার তা ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২.৫ শতাংশে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ২৭৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীর ১১৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৯ জন, নওগাঁর ২৬ জন, নাটোরের ৪৪ জন, জয়পুরহাটের ১৮ জন, বগুড়ার ১৭ জন, সিরাগঞ্জের সাতজন ও পাবনার ১১ জন।

নাটোর জেলা সংবাদদাতা মো. আজিজুল হক টুকু জানিয়েছেন, নাটোরে করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থা বিরাজ করছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যে, নাটোর শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১৭১৩ জন, সুস্থ ১৪৭৩ জন, আর মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যে, নাটোর সদর হাসপাতালে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৬ জন করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। আর মাত্র ৫টা বেড ফাঁকা রয়েছে। নাটোরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এখনই মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। শহর এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বোগজনক।

এ ব্যাপারে নাটোরের সিভিল সার্জন কাজী মিজানুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ১১০ জনের করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৫০ জনই করোনা পজেটিভ রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪৮ জনই নাটোর শহর এলাকার বাসিন্দা। অর্থাৎ করোনা আক্রান্তের ৯০ ভাগ ব্যক্তিই শহর এলাকার বাসিন্দা।

এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাবধানে ও স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করে চলাচলের জন্য নাটোর পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং অব্যাহত রয়েছে বলে জানান নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলি।
এদিকে নাটোরে নতুন করে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। গতকাল শনিবার দুপুরে শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ মার্কেট, ছায়াবানী মোড়, নীচাবাজার এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনাকালে জনসাধারণের মাঝে মাস্ক বিতরণ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ, পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহাসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ। লিটন কুমার সাহা জানান, শহরে করোনা সংক্রমণ বেশি হওয়ায় শহরের বিভিন্ন স্থানে স্পেশাল টিম সহ ৬টি মোবাইল টিম কাজ করছে। সম্প্রতি চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রাজশাহীর পর নাটোরে করোনা’র সংক্রমণ বেশি হওয়ায় জেলায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button