বগুড়া সদর উপজেলা

বগুড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণীকে গরুর মাংস খাওয়ানোর ঘটনা আপোষ

বৃহস্পতিবার বিকালে বগুড়া শহরের অভিজাত বিপনী বিতান রানার প্লাজা’র ‘সম্পাস ডাইন’ নামে একটি চাইনিজ রেস্তরাঁয় বগুড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে চিংড়ির কারির সাথে গরুর মাংস মিশিয়ে খাওয়ানোর অভিযোগ উঠে। শুক্রবার ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তোড়পাড় শুরু হয়।

জানা যায়, বগুড়া শহরের নবাববাড়ি সড়কে ব্যবসায়ী সাইরুল ইসলামের মালিকানাধীন আধুনিক বিপনী বিতান রানার প্লাজা। সেখানে সম্পাস ডাইন নামে একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় অভিজাত পরিবারের সদস্যরা খাওয়া-দাওয়া করে থাকেন। বৃহস্পতিবার বিকালে বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার সনাতন ধর্মাবলম্বী অনন্য দাস বৃষ্টি নামে এক তরুণী বন্ধুদের সাথে ওই রেস্তরাঁয় খেতে আসেন। তিনি ওয়েটার আনন্দীকে ফ্রাইড রাইস ও চিংড়ি কারির অর্ডার করেন। খাওয়ার সময় হিন্দু তরুণী দেখতে পান চিংড়ির সাথে গরুর মাংস মেশানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওই তরুণী প্রতিবাদ করেন এবং বমি করে ফেলেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওই তরুণী কান্নাকাটি করছেন, তিনি সম্পাস ডাইন’এর কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে গরুর গোশত খাওয়ানের প্রতিবাদ করেন। তিনি এ ব্যাপারে কৈফিয়ত চান। তখন রেস্তরাঁর লোকজন বলেন, তারা জানতেন না তিনি (তরুণী) হিন্দু। তারা এ ঘটনায় সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। তরুণীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। ঘটনাটির ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তোলপাড় বৃষ্টি হয়।

উক্ত ঘটনায় হিন্দু মহাজোট পরিবার মনে করে এ ঘটনা শুধু একটি রেস্টুরেন্টের চিত্র নয়; সমগ্র দেশের চিত্র। নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ জানিয়ে এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বগুড়া পৌর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি পরিমল প্রসাদ রাজ ও সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার তালুকদার অপর এক বিবৃতিতেও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন।

বগুড়া সদর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মঞ্জুরুল হক ভুঞা জানান, ফেসবুকে এক হিন্দু তরুণীকে চিংড়ির তরকারির সাথে গরুর মাংস খাওয়ানের ভিডিও দেখতে পান। শুক্রবার শহরের রানা প্লাজার ৭তম তলায় সম্পাস ডাইনের ওয়েটার শহরের কলোনী এলাকার আনন্দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। এছাড়া দুপচাঁচিয়ার ওই তরুণীকেও ডাকা হয়েছে। তারা অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বগুড়া পৌর পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার তালুকদার জানান, বিষয়টি কোন নেতার উপস্থিতিতে আপোষ হয়েছে তিনি জানেন না।

শুক্রবার রাতে বিষয়টি আপোষ করার একটি ভিডিও এবার ফেসবুকে দেখা যায়, ভিডিওটিতে তরুণী বৃষ্টির ইনবক্সে পাঠানো একটি লেখা দেখে পড়তে দেখা যায়, সংগ্রহীত নিচের লেখাটি –

নমস্কার।।
আমি অনন্য বৃষ্টি,

(আমি গুছিয়ে কিছু বলতে পারিনা। এলোমেলো হয়ে যাই বলতে বলতে। বিশেষ করেতো ওত লোকজন আর ক্যামেরার সামনে আরো। তাই স্ক্রিপ্ট লিখে নিছিলাম নিজের মত করে, এক পর্যায়ে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ীও বলে শেষ করতে পারিনি। ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে ভিডিওটা দেখার এবং লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল

আমার সাথে গত ২০-০৫-২০২১ তারিখ বৃহস্পতিবার Shompas Dine, রানার প্লাজা, বগুড়াতে যে গঠনা ঘটেছিলো ইতিমধ্যে সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে আপনারা অনেকেই অবগত আছেন। এরকম ঘটনা আমাদের দেশের আনাচে কানাচে অহরহ প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এরকম ঘটনা নতুন কিছুনা আমাদের দেশে। আমার মত অনেক দাদা-দিদিই যারা বাইরে খাওয়া দাওয়া করেন তারা হয়তো কোন না কোন পর্যায়ে এরকম ঘটনার স্বীকার হয়েছেন।

আমি প্রতিবাদ করেছি এবং আপনাদের কল্যাণে সেটা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আপনারা দ্রুতটার সাথে ভিডিওটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভেদাভেদ ভুলে একত্রে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। যার দরূণ আমাদের কমিউনিটির বড় বড় নেতৃবৃন্দ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের খুব সহজেই নজরে পড়ে। মুহূর্তের মাঝেই আমাকে ফোন করে, ম্যাসেঞ্জারে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা ও বার্তা দিয়ে পাশে থেকেছেন। আপনারা এভাবে এগিয়ে না এলে এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনার কোন প্রতিবাদই হত না। এজন্য আপনাদের প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। আমি চাই ভবিষ্যতেও আমাদের হিন্দু সমাজের সাথে হয়ে যাওয়া যেকোন অন্যায় গুলোর ব্যাপারে আপনারা আবার একত্র হয়ে প্রতিবাদ করবেন।

এখন আপনাদের কঠোর প্রতিবাদের দরুন ঘটনার দিন মাঝরাতেই বগুড়া সদর থানার পুলিশ গিয়ে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার ও সেই মহিলা ওয়েটারকে গ্রেফতার করে এবং মালিক বরাবর একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। তাদেরকে একদিন একরাত আটকে রেখেছিলো। মহিলাটির একটি শিশু বাচ্চা ছিলো, সে সারাক্ষণ মা মা বলে থানা হাজতে কাঁদছিলো।
ব্যাপারটি সত্যিই আমাকে অনেক নাড়া দিয়েছে।

পরবর্তীতে বগুড়ার স্থানীয় হিন্দু নেতৃত্ববৃন্দ ও সংগঠন গুলো, ভোক্তা অধিকার, সাংবাদিকরা আমার সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদের উপস্থিতিতে সবাই মিলে এক বৈঠক হয় গত রাতে রেস্টুরেন্টে মালিককে সাথে নিয়ে।

সেই বৈঠকে হোটেল মালিক জনসমক্ষে ক্ষমা নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে আর এধরণের কাজ যাতে কখনো না হয় সেব্যাপারে লিখিত দিয়েছে। এছাড়াও তারা রেস্টুরেন্টে নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত সেব্যাপারে ক্ষতিয়ে দেখবে এবং সেই মহিলা ওয়েটারকে আপাতত বহিষ্কার করা হইছে।

রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির জন্য বারংবার অনুতপ্ত। আর আমাদের সনাতন ধর্ম যেহেতু সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। তাই আমি অনুতপ্তকে ক্ষমা করাই বাঞ্চনীয় মনে করেছি। এবং তাদের অনুরোধ করেছি, আপনার রেস্টুরেন্টে যে ঘটনা ঘটেছে এরকমটি যেন সারা বাংলাদেশে আর কোথাও না ঘটে এব্যাপারে সকল রেস্টুরেন্টে ও হোটেল মালিকদের প্রতি আহবান জানাতে।

ভোক্তা অধিকার এবং হিন্দু সংগঠনের পক্ষ থেকে জরিমানার করার কথা বললেও আমি এবিষয়ে সম্মতি প্রদান করিনি এবং তাদের জরিমানা করতে নিষেধ করার অনুরোধ জানিয়েছি।

কারণ জরিমানা করলে হয়তো সেই টাকার কিছু অংশ আমি পেতাম কিন্তু আমার তো কোন আর্থিক ক্ষতি হয় নি যে তাদের অর্থদণ্ড আমার নিতে হবে।

আবার এটা কোন টাকা – পয়সার প্রশ্নও না, এটা আমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং আমাদের ধর্মীয় আমার স্বল্প জ্ঞান দ্বারাই জনসম্মুখে বলার ও ক্ষমার মহত্ত্ব দেখিয়েছি।

অনেকের মাঝে হয়তো আবার প্রশ্ন জাগছে, আমি সত্যি সত্যিই বিফ খেয়েছি কিনা,

না দাদা-দিদিরা আমি বিফ খাইনি। আমি জাস্ট এক চামচ ফ্রাইড রাইচ মুখে দিয়েছি এবং চিংড়ির কারিটা মুখে নিবো বলে নাড়াচাড়া করতেই মাংসের মত কিছু একটা দেখতে পেয়ে দায়িত্বরত ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
জবাবে সে বিফের কথা বলে এবং ভুলে চলে এসেছে আমার প্লেটে বলে জানায়। (যারা আমার প্লেটের ছবি দেখেছেন, ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছেন।)
আর আমি যদিও চিংড়ির কারিটি খাইনি তবুও সাথে সাথে বমি করেছিলাম। এবং কান্নাকাটি করে প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি নিজেও পরবর্তীতে বাইরে খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হবো, আপনারাও হবেন বলেই অনুরোধ করবো।

আরেকটা কথা সম্ভবত আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে পাশে এক মুসলিম ছেলের গলা শুনছিলাম। ছেলেটা কে? তাকে নিয়ে আমি কেনই বা রেস্টুরেন্টে বসলাম?

আপনারা অনেকেই অবগত আছেন আমি অনলাইন বিজনেস করি। আর অনলাইন ব্যবসায় ডেলিভারি সংক্রান্ত ব্যাপারে অনেকের সাহায্য প্রয়োজন। বগুড়ার এক স্থানীয় ছেলেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বগুড়ার ভিতরের হোম ডেলিভারি এবং আমার বাসা দুঁপচাচিয়া থেকে পণ্য নিয়ে এসে কুরিয়ার করার জন্য আমার বাগদত্তা হবু স্বামী নিয়োগ দিয়েছে।

আমার প্রতিষ্ঠানের লোকবল নিয়োগ, প্রডাক্ট সংগ্রহ থেকে শুরু করে সার্বিক ব্যাপার সেই মেইনটেইন করে। আমি মালিক হয়েও আমার হবু স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কিছুই করতে পারিনা। আর আমার প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে আমি কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধির জন্য ট্রিট দিতেই পারি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আর একটা কথা বলি, আমার প্রতিষ্ঠানের ৯০% কর্মকর্তাই সনাতন ধর্মাবলম্বী।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1714793935389630&id=100005771197993

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button