ফিচার

শারীরিক প্রতিবন্ধী মহুয়া অনলাইেন মাধ্যমে এখন একজন সফল উদ্যোক্তা

বগুড়া শহরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া (২৬)। শারীরিকভাবে সে প্রতিবন্ধী। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা তাকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। অনলাইনে ব্যবসা করে হয়েছেন লাখপতি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রয়েছে ‘Rainbow রংধনু’ নামে একটি পেজ। এ পেজের মাধ্যমে তার পণ্য যাচ্ছে বিশ্বের ১৭টি দেশে। এখন তার কর্মী ২৫ জন। সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত মানুষদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে থেকেই তার এ প্রচেষ্টা।

প্রতিবন্ধী মানে বোঝা নয়, প্রতিবন্ধীরাও সংসারের হাল ধরতে পারে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন মহুয়া। স্বাবলম্বী হয়ে মায়ের দুঃখ মোচন করেছেন তিনি। এখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্ঠা করছেন।

চার বছর ধরে তিনি অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। করোনাকালীন প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেছেন। গত এক বছরে ৭ লাখ টাকার বেশি পণ্য বিক্রি করেছেন তার ‘Rainbow-রংধনু’ পেজের মাধ্যমে।

জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করছেন। মহুয়া অনলাইনে ঐতিহ্যবাহী মসলিন ও খাদি কাপড় দিয়ে তৈরি নানা রকমের পোশাক তৈরি করে বিক্রি করছেন। প্রশংসাও কুড়িয়েছেন, তার ঝুলিতে যোগ হয়েছে বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ডও। 

দুই ভাইয়ের আদরের বোন মহুয়া। জন্মের পর থেকেই তিনি প্রতিবন্ধী। বাবা মরহুম আব্দুল মজিদ ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। মা ছাহেরা বেগম গৃহিণী। বাবা ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়ায় তার চিকিৎসার কোনো কমতি ছিল না। মেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মা ছাহেরা বেগম কাঁদতেন। কখনো কাউকে বুঝতে না দিলেও মহুয়া বুজতেন মায়ের কষ্ট। 

২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’ পান। তারপর বগুড়া শাহ সুলতান কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময় মা প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট পথ পায়ে হেঁটে হুইল চেয়ার ঠেলে মেয়েকে কলেজে নিয়ে যেতেন। 

বগুড়া শহরের চকলোকমান খন্দকার পাড়ায় নিজ বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকেন জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া। চকলোকমান এলাকায় রোববার বিকেলে মহুয়ার বাড়ির খোঁজ করতেই বেশ কয়েকজন তার বাড়ি দেখিয়ে দিলেন। 

জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া এখন একজন পুরোদস্তুর উদ্যোক্তা। বাড়ির ভেতরে তার ঘরটি ছোটখাট শোরুম বললে ভুল হবে না। কাজ করছেন কয়েকজন। কাজের ফাঁকে কথা হয় মহুয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, বগুড়া শহরের কয়েকজন, শেরপুর উপজেলা নয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন ও ছোনকা বাজার এলাকার বেশ কয়েকজন নারী কাজ করে। হাতের কাজ নিজেও পারি। তবে এখন পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি। 

জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া বলেন, প্রথমে ওরনা, থ্রি-পিস, শাড়ি দিয়ে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করি। অনলাইন প্লাটফর্মে সফল হতে পারব ভাবিনি। স্মার্টফোন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কয়েকটি পেজে পণ্য সেল করার চেষ্ঠা করি। কিন্তু ব্যর্থ হই। বুঝে উঠতে পারিনি কেন এমন হচ্ছে। তারপর বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা করি। বেশকিছু পেজের মাধ্যমে হাতের কাজ শিখতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হই।

২০১৭ সাল থেকে অনলাইনে পণ্য বিক্রির চেষ্ঠা করি। যখনই ব্যর্থ হয়েছি মায়ের কাছে সহযোগিতা পেয়েছি। একবার না পারলে দেখ শতবার কবিতাটি স্মরণ করেছি। চেষ্ঠা কখনও থামাইনি। ‘Rainbow-রংধনু’ নামে একটি পেজ খুলি ফেসবুকে। পেজে এখন ফলোয়ার সাড়ে ৪ হাজারের ওপর। পেজের মাধ্যমে ও বিভিন্ন ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমে এখন তৈরি করা ও কাস্টমাইজ করা পণ্য বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৭টি দেশে পণ্য পাঠিয়েছি। এখনও বেশ কয়েকটি অর্ডার রয়েছে সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে পাঠানোর জন্য।

ব্যবসা শুরুর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মহুয়া বলেন, প্রথমে শুরু করেছিলাম থ্রিপিস, শাড়ি দিয়ে। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়ান পিস, নানা ধরনের শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কভার, সোফার কভারসহ আরও অনেক কিছু। আগে শুধু সুতি কাপড়ে কাজ করতাম। এখন পণ্যের গুণগত মানের কথা মাথায় রেখে কাপড়ের বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছি। কুমিল্লার খাদি, রাজশাহীর মসলিন, সিল্কসহ মোটামুটি সব ধরনের পণ্য রয়েছে। 

বিখ্যাত মসলিন কাপড় সম্পর্কে মহুয়া বলেন, ৬ মাস আগে থেকে মসলিনের কাজ করছি। কিন্তু মসলিন নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা যাই বলা হোক না কেন তা করেছি প্রায় এক বছর। কারণ মসলিন নিয়ে কাজ করব, তার সম্পর্কে না জেনে কাজ করলে ফলাফল খারাপ হতে পারে। খুব রিস্ক নিয়ে কাজ শুরু করি মসলিনের মিহি কাপড়ে। সফলতা আসে। এখন হাতের কাজ চলছে মসলিনের ওপর। বিক্রয়ে সাড়াও মিলেছে। উই গ্রুপের মাধ্যমে প্রথম মসলিন কাপড় বিক্রি করি। তারপর থেকে অর্ডার আসছে। কর্মীদের নিয়ে কাজ চলছে।

জীবনের কথা বলতে গিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া বলেন, ‘বাবা-মা, ভাইদের আদরে বড় হয়েছি। তবে আমি নিজে তুলে খেতে পারি না ভালোভাবে। মা আমাকে সাহায্য করেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মা আমার ভরসা। ভাইয়ারা খুব ভালোবাসেন আমাকে। 

এসএসসি পাস করার পর থেকে সময় কাটানোর জন্য আশপাশের বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতাম। তাদের সঙ্গেই অনেকটা সময় কেটে যায়। ২০১৬ সালে প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। জমানো সেই টাকা দিয়ে একটি স্মার্টফোন কিনি। তখন থেকেই ফেসবুক ইউটিউব দেখতাম। ফেসবুকে বেশ কিছু পেজে মডারেটর হিসেবে কাজ করেছি। প্রতারণার শিকার হয়েছি। তবে শিখেছি বলেই আজ সফল।

মহুয়ার কর্মী বগুড়ার শেরপুর উপজেলার নয়াপাড়ার মেয়ে আরবী খাতুন। পড়াশোনা করেন স্নাতক প্রথম বর্ষে। আরবী খাতুন জানান, মহুয়া আপু খুব ভালো। কাজের ভুল হলে তা ধরিয়ে দেন। খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। কখনও তাকে রাগ করতে দেখিনি। আগে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি ভুল হলে খুব বকাঝকা করত। কাজের দামটাও ঠিকমত দিত না। 

মহুয়ার সঙ্গে তার ব্যবসায় সহযোগিতা করছেন তার মামি সার্জিনা আক্তার। সার্জিনা আক্তার বলেন, সম্প্রতি স্বামী মারা যাওয়া ও করোনা পরিস্থিতিতে খুব বিপদে পড়ে যাই। রাজধানী ঢাকা ছেড়ে বগুড়ায় আসি। একটি স্থানীয় কিন্ডারগার্ডেনে শিক্ষকতার চাকরি শুরু করি। কিন্তু মেয়ে ও ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যায়। মহুয়া সাহস দেয় অনলাইনে ব্যবসা করার বিষয়ে। তার ব্যবসায় সহযোগিতা শুরু করি। 

আমার সংসারও ভালভাবে চলতে শুরু করে। বড় মেয়ে এখন ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। ছোট ছেলেকে নিয়ে বগুড়ায় মহুয়ার বাড়ির পাশেই থাকি। নিজেও মহুয়ার মত ‘আতুরিয়ানা’ নামে ব্যবসা শুরু করেছি। তবে মহুয়াকে নিয়েই চলছে সে ব্যবসা। সত্যিই মহুয়ার মতো মেয়েরা সমাজের বোঝা নয়, ওরা সম্পদ।

মহুয়ার পরিবারে বাবা নেই। মা ছাহেরা বেগম, বড় গোলাম মোস্তফা ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির লেকচারার, মেজ ভাই মোহাম্মাদ আলী একাট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শহরের চকলোকমান খন্দকার পাড়ায় তারা নিজ বাড়িতে বসবাস করেন।

ছাহেরা বেগম, মহুয়ার মা বলেন, বই পড়তে ভালো লাগে মহুয়ার। যখন যে বই সামনে আসে সেখান থেকে জানার ও কিছু শিখার চেষ্ঠা করেন। মহুয়ার কথা শুনতে শুনতে লক্ষ্য করলাম, মেয়ের সফলতার গল্পে মা ছাহেরা বেগমের চোখ ছলছল করছে। মেয়ের জন্য আগে লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করতাম। কাউকে বুজতে দেইনি। মহুয়াকে ওর বাবা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য ভালো করে পড়াশোনা করতে বলত। ও খুব পড়াশোনা করত। কিন্তু কখন যে সে একজন উদ্যোক্তা হয়ে উঠল তা বুজতে পারিনি। সে শুরুতে আমাদের কিছু জানাইনি। পরে যখন সফলতা আসতে শুরু করে তখন জেনেছি। এখন পাড়ার লোকেরা আমাকে মহুয়ার মা বলে ডাকে। শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মহুয়া আমার সম্মান বাড়িয়ে তুলেছে।

সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাছ করতে চান মহুয়া। তিনি বলেন, আমার ইচ্ছে বগুড়া শহরে ‘Rainbow-রংধনু’ নামে একটি শোরুম থাকবে। যেখানে শুধু ‘ Rainbow-রংধনু’ নিজস্ব পণ্যের সমাহার থাকবে। ব্যবসার লাভের একটা অংশ থেকে প্রতিবন্ধী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করব। যাতে তারা পরিবারের বোঝা নয়, সম্পদ হয়ে ওঠে। 

নারী দিবসে তিনি সকল নারীকে শুভেচ্ছা জানান এবং এক সঙ্গে কাজ করা আহ্বান জানান। প্রতিবন্ধী মানে প্রতিবন্ধকতা না, প্রতিবন্ধীরা সহযোগিতা পেলে হয়ে উঠবে দেশের সম্পদ এমনটাই মনে করেন মহুয়া।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button