নব্যদীপ্তি_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

“ভালোবাসার প্রতি ভালোবাসা!”

দশ মাস দশ দিন মাতৃগর্ভে থাকা একটা শিশু যখন পৃথিবীর আলো দেখতে শেখে, তার চারিদিকের অচেনা পরিবেশ যে পবিত্র সংগীতে আন্দোলিত হয়, তা ভালোবাসা। আবার সেই সত্ত্বা একদিন যখন বস্তুলোকের মায়াত্যাগে যাত্রা শুরু করে, তখন তার চারিদিকের যে বিষন্ন বিরহী সুরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, সেই সুরের মর্ম ভালোবাসা। হোক সেটা বাংলাদেশের কোনো নিভৃত পল্লীর যুবক যুবতীর নদীর পাশে একসাথে বসে শিমুল কৃষ্ণচূড়া বিনিময়, কিংবা সুদূর আফ্রিকায় একটা হিংস্র চিতার নিজের সন্তানকে হায়নার হাত থেকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা – পার্থক্য টা শুধু কাল আর স্থানের। কিন্তু তার পেছনের মহাকাব্যিক শব্দ- সেটিই ভালোবাসা। আবার মহান স্রষ্টার জন্য নিজের সন্তানের ভালোবাসাকে বারবার প্রকম্পিত হৃদয়ে উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করেননি ইবরাহীম(আ), সেটিও ছিল স্রষ্টার প্রতি অসীম ভালোবাসা।
” ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। ” এর চেয়ে পবিত্র বা সুন্দর কোনো বাক্য পাওয়া যে এক দূরহ ব্যাপার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভালোবাসার কোনো রূপভেদ নেই। হতে পারে কখনো তা আকাশতুল্য আবার কখনো তাতে বিদ্যমান মেঘমালার ন্যায়। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসার ভিতরের যে ঐকান্তিক মনোভাব তা সব সময়ই এক এবং অভিন্ন।
ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসায় যেদিন তার প্রেমিক নিজের সম্প্রদায়ের কাছে জীবন বলি দিয়েছিল, সেদিন তার জীবনের চেয়ে বড্ড প্রয়োজনীয় ছিল এই ভালোবাসা। কারণ প্রাণ না থাকলে যেমন ভালোবাসার অস্তিত্ব থাকে না, ভালোবাসা না থাকলে সেই প্রাণ নিতান্ত অবাস্তব আর অচল। উদাহরণ হিসেবে মাদকতো আছেই যার পেছনের গল্পটা ভালোবাসার চাহিদা, হয় পরিবার কিংবা সমাজ আবার কোনো বিশেষ কেউ। ভালোবাসাকে ভর করেই মানুষ তার স্বপ্নের মালা গাঁথতে শেখে। ভালোবাসা শেখায় নিজেকে চিনতে, শেখায় নস্টালজিক হয়ে অনুভূতির রস আস্বাদনে, শেখায় পবিত্র হতে, শেখায় এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উপভোগে।
১৪ ফেব্রুয়ারি, আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন’স ডে। কোটি কোটি সত্ত্বা আজকের দিনটাকে তার ভ্যালেন্টাইনের জন্য একটু বিশেষ করেই রেখে দেয়। হয়তো জীবন বলি দেয়ার জন্য না, কিন্তু একটা বিশ টাকার গোলাপ কিনে তার কানে পরিয়ে দেয়ার মাঝের সৌন্দর্য – অতুলনীয়।
আমাদের সংস্কৃতি যে ভালোবাসার। লাইলি- মজনু কিংবা ইউসুফ জোলেখা শুধু কিতাবের চরিত্র নয়।

সভ্যতার বিকাশ তার সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে, তা নিতান্ত সত্য। আজকের শতকে ভালোবাসার রূপে হয়তো কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে, তবে সংজ্ঞাটা ঠিক একই রয়ে গিয়েছে। যেটা ইতিবাচক অনেক ক্ষেত্রে। যেমন ধরুন, এখন নিয়মিত দুই চারটা প্রেমপত্র লিখতে লুকিয়ে লুকিয়ে বাঁশঝাড়ে মশার কামড় খেতে হয় না, আর সেটা পাঠানোর জন্য সামান্য একটু কানেকশন যথেষ্ট। আবার প্রেমিকের জন্য একটা কবিতা লিখে তা আবৃত্তি করার জন্য খেলার মাঠ থেকে পালিয়ে নদীর পারে যেতে হয় না। এর মাঝেও রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। আফটার অল, একটা আধুনিক আধুনিক ভাব আছে বলা যায়। এর সবটুকু প্রেমই ভালোবাসা।
তবে অপসংস্কৃতির প্রভাবে নেতিবাচক কিছু পরিবর্তন হবে না- একথা ভাবার অবকাশ নেই। কারণ আজকের সমাজে প্রেমকে এতোটাই বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হয়, যে লোকের কাছে প্রেম অর্থই যেন কলুষতা আর অশ্লীলতা। দূর্ভাগ্য! আমরা আজকে প্রেমের মূলবানী থেকে দূরে সড়ে আসতে শুরু করেছি৷ সত্যিকারের ভালোবাসার পবিত্রতাকে আমরা দূরে রেখে মেতে উঠেছি নিষ্ঠুর ভালোবাসা নামক ঘৃণার দিকে। হ্যাঁ, একে আমি ভালোবাসা বলতে চাই না, এটি ঘৃণা। বিশেষ করে একদল তরুণ তরুণী তো আজ এতোটাই মেতে উঠেছে এই খেলায় যে, একবিংশ শতাব্দীর প্রেমের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে বিচ্ছেদ আর বিষন্নতা। প্রেমের মর্ম এরা বোঝে না, তাই তাদের কাছে নিয়মিত নতুন প্রেমিক-প্রেমিকা খুঁজে নেওয়ার প্রবণতা দেখা খুব অস্বাভাবিক না।
প্রেম মূলত ভালোবাসার এক বিশেষ রূপ, যা শেখায় ত্যাগে, যা অনুপ্রাণিত করে মহানুভবতার প্রতি। বিশ্বাস করুন, প্রেম অর্থ না পাওয়া। পেয়ে গেলে তা আর প্রেম থাকে না। আর বুদ্ধিমান মানুষ কখনো একাধিক প্রেমে পড়বেনা। আর এই প্রেমের ভিতর কখনো অপবিত্রতার ছোঁয়া নেই। যা আছে, তার সবটুকুই ভালোবাসা। প্রিয়জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে শেখায় প্রেম। তার জন্য নিজেকে তার থেকে সরিয়ে আনাটাও প্রেমেরই এক শিক্ষা।

তবে আমরা যেন ভালোবাসা বলতে শুধুই তরুণ তরুণী, যুবক যুবতীর প্রেমকেই না উল্লেখ করি। তাহলে কিছু মিথ্যা প্রেমের গল্পের জন্য সমাজে ভালাবাসা শব্দটিও এক কলুষিত শব্দে পরিণত হতে পারে।
ভালোবাসার পবিত্রতা ছড়িয়ে যাক পৃথিবীর প্রতিটি কণায় কণায়। তাহলে হয়তো বিশ্বটা শান্তি পাবে। শান্তি পাবে প্রতিটি মানুষ, শান্তি পাবে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, শান্তিতে নতুন প্রভাতের স্বপ্ন দেখবে অগাস্টা হাসপাতালে আহত শিশুটাও।
বিশ্ব হোক শান্তির।
জয় হোক ভালোবাসার।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button