নব্যদীপ্ত_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

হিজড়া বা অটিস্টিক কোন গালি নয়

আমরা আধুনিক যুগের মানুষ। নিজেদেরকে সভ্য সমাজের সভ্য বা আধুনিক মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই আমরা বেশি পছন্দ করি। কিন্তু আমাদের সকল কাজকর্ম বা কথা কি আধুনিকতার পরিচয় বহন করে? আমি হলফ করে বলতে পারি আমাদের সমাজের ৬০ শতাংশ মানুষই নিজের মানসিকতার দিক থেকে এখনো সভ্য বা আধুনিক হতে পারেনি যার উদাহরণ আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি। তেমনই একটি উদাহরণ হলোঃ “হিজড়া” বা “অটিস্টিক” শব্দগুলোকে গালি হিসেবে ব্যবহার করা।

আমরা অনেক সময় মজা করেই নিজের বন্ধুবান্ধব বা কাউকে অটিস্টিক বলে গালি দিয়ে থাকি। কিন্তু এই শব্দটি কি আসলে গালি?

অটিজমে আক্রান্তদের অটিস্টিক বলা হয়। অটিজম শিশুদের একটি মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা। ইংরেজিতে একে বলে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। এটি কোনো মানসিক রোগ নয় এবং এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। এর লক্ষণগুলো সাধারণত শিশুর জন্মের দেড় থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এরা পরিবেশের সঙ্গে যথাযথভাবে খাপ খাওয়াতে পারে না, নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে, নাম ধরে ডাকলেও খুব একটা সাড়া দিতে চায় না। সাধারণভাবে অটিস্টিক শিশুরা একই কথা বারবার বলে এবং একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে। এদের আচার-ব্যবহার ও সংবেদন পদ্ধতি সাধারণ শিশুদের থেকে আলাদা। এই কথায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু।
অথচ এই অটিস্টিক শব্দটি আমরা যখন গালি হিসেবে ব্যবহার করি তখন এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের আমরা কতটা ছোট বা হেয় করছি সেটা কি আমরা বুঝি? হয়তো না বুঝেই বলে ফেলি।

তেমনই আরেকটি শব্দ হলো “হিজড়া” যা গালি হিসেবে বা কাউকে অপমান করতে ব্যবহার করা হয়।

নারীও নয় আবার পুরুষও নয়- এধরনের একটি শ্রেণীকে আমরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে কিংবা দোকানপাটে বিভিন্নরকম অঙ্গভঙ্গি করে চাঁদা তুলতে দেখি। আমরা যারা সভ্যসমাজের মানুষ, তারা এই অবহেলিত শ্রেণীটিকে ‘হিজড়া’ বলে ডাকি। হিজড়া নারী আর পুরুষের মত নয়, হিজড়াদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হিজড়া শব্দকে তারা অভিশাপ বা গালি হিসেবে মনে করেন। আসলে তারা হচ্ছেন, ট্রানজেন্ডার। প্রকৃতির নিয়তিতেই এরা স্বাভাবিক মানুষের পরিবর্তে হিজড়ায় রূপান্তরিত হয়। ঠিক যেমনটি ঘটে থাকে একজন প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, প্রতিবন্ধীদের জন্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে সমাজের মূলস্রোতের অন্তর্ভূক্ত করতে নানারকম সরকারি-বেসরকারি আন্দোলন ও পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হলেও হিজড়াদের কল্যাণে এরকম কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না আমাদের দেশে। সভ্যসমাজ থেকে একপ্রকার নির্বাসিত এই শ্রেণীর মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে সাহায্য করতে না পারলেও আমরা যেনো তাদেরকে ছোট করে না দেখি বা এই “হিজড়া” শব্দটিকে গালি হিসেবে ব্যবহার না করি তা নিশ্চিত করা উচিত।

আধুনিকতা শুধু শো-অফে না বরং নিজের কাজেকর্মে, আচার-ব্যবহারেও প্রকাশ পাওয়া উচিত। শুধুমাত্র মজা করার উদ্দেশ্যে এক শ্রেণীর মানুষের পরিচয়কে আমরা গালি বানিয়ে ফেলতে পারিনা, তাদেরকে অপমান কিংবা কটাক্ষ করতে পারিনা।

আসুন আমরা প্রকৃত অর্থেই একটু আধুনিক হই, নিজেদের মানসিকতাকে আরো উন্নত করি। মানুষকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে শিখি। কারো হাসিমুখের কারণ না হতে পারলেও কারো অপমান বা কষ্টের কারণ না হই। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি সদয় হই। আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে এবার মানুষ হই।

তাসনিয়া তাসনিম শ্রুতি
নব্যদীপ্তি_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button