শিক্ষা

করোনাকালীন সময়ে ভর্তি-টিউশন ফি নিয়ে চাপে অভিভাবকরা

‘করোনাকালে পুনঃভর্তি ফি নেওয়া যাবে না’ মর্মে গত ১৮ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি সার্কুলার জারি করেছিল। সেখানে মোট ৭টি খাত- অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গ্রহণ করতে পারবে না। বাস্তবে এ নির্দেশনার ছিটেফোঁটাও মানছে না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বছরের শুরুতে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রছাত্রীদের নতুন করে ভর্তি ও পুনঃভর্তি করছে। এই করোনা মহামারিতেও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত বছরের জানুয়ারির সমান ফি নিচ্ছে। কেউ কেউ ফি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভর্তি ও টিউশন ফি নিয়ে বছরের শুরুতেই প্রচণ্ড চাপে পড়ে গেছেন অভিভাবকরা।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, পুরোনো শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভর্তি করিয়ে তাদের কাছ থেকে পুনঃভর্তি ফি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ছোট-বড় প্রতিটি বিদ্যালয় চলতি জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভর্তি নিতে শুরু করেছে। তবে পুনঃভর্তি ফি নিতে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ‘কৌশলে’ কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার বছরের শুরুতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন না করেই বই বিতরণসহ অন্যান্য কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। তারা এমনকি ভর্তি, পুনঃভর্তি বা জানুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য অভিভাবকদের এখন পর্যন্ত কোনো নোটিশ করেনি।

এমনই একটি প্রতিষ্ঠান খ্যাতনামা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি অভিভাবকদের কাছ থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওনাদি আদায় করলেও জানুয়ারিতে ভর্তি, পুনঃভর্তি বিষয়ে এখনও কোনো নোটিশ করেনি অভিভাবকদের। এমনকি জানুয়ারি মাসের বেতন দিতেও নোটিশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত প্রতি তিন মাসের বেতন একসঙ্গে নিয়ে থাকে। রাজধানীর বেইলি রোডের মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরা তিনটি ক্যাম্পাস মিলিয়ে প্রায় ২৯ হাজার ছাত্রী রয়েছে।

একইভাবে ভর্তিতে কিছুটা ‘ধীরে চলো নীতি’ নিয়েছে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। স্কুলটির বনশ্রী শাখার এক অভিভাবক জানান, তার সন্তান অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। বিদ্যালয় থেকে শ্রেণিশিক্ষক জানিয়েছেন, ভর্তি হতে ৭ হাজার টাকা লাগবে। গত বছর আট হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। করোনার কারণে এক হাজার টাকা এবার কম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিদ্যালয়ের দুটি শাখাসহ তিন ক্যাম্পাস মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

মিরপুরের মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তিতে সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা লাগছে। শেওড়াপাড়া শাখার এক অভিভাবক জানান, তার কন্যা দশম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। ভর্তি ফি আট হাজার টাকা, জানুয়ারির বেতন দেড় হাজার টাকা ও অন্যান্য ফি আরও ৫০০ টাকা। এই বিদ্যালয়ের মূল বালক শাখা, বালিকা শাখা এবং আরও তিনটি শাখা ক্যাম্পাস মিলিয়ে প্রায় ৩৪ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি শুরু করেছে। পুরোনোদের এখনও ভর্তির জন্য এসএমএস দিয়ে কোনো নোটিশ করেনি।

মিরপুরের বনফুল আদিবাসী গ্রীণহার্ট কলেজের ইংরেজি ভার্সনের এক অভিভাবক জানান, তার সন্তানকে প্লে গ্রুপে ভর্তি করতে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ টাকা লেগেছে। এ ছাড়া নার্সারি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৭ হাজার ১০০ টাকা করে ভর্তিতে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের গ্রীন ফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক অভিভাবক জানান, পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি ফি ১৪ হাজার টাকা। তার সন্তানকে করোনার কারণে বিশেষ মওকুফের কারণে ১১ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে ভর্তি করাতে পেরেছেন।

মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকার গ্রীণ উডস্‌ স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে লাগছে ১৪ হাজার টাকা। খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ গত বছর করোনার নয় মাসে অভিভাবকদের দুই মাসের টিউশন ফি মওকুফ করে দিয়েছিল। এক অভিভাবক জানান, এবার তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি ফি ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে।

রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক মাসের বেতনসহ তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে লাগছে আড়াই হাজার টাকা। তবে আবাসিক সুবিধা নিলে আট থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত লাগবে বলে এক অভিভাবক জানান। সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক অভিভাবক বলেন, তিনি দশম শ্রেণিতে তার সন্তানকে সাড়ে ১০ হাজার টাকায় ভর্তি করিয়েছেন। একাধিক অভিভাবক জানান, করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও ভর্তি বা টিউশন ফির ব্যাপারে কোনো ছাড় পাচ্ছেন না তারা।

বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সারাদেশের নিম্নআয়ের অসংখ্য মানুষ। নতুন করে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ সংকটকালেও বেতন-ফি আদায়ে অভিভাবকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে চলেছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
আসিফ শাহরিয়ার নামে নামে এক অভিভাবক বলেন, করোনার প্রকোপ কিছুমাত্র কমেনি। অথচ টিউশন ও ভর্তি ফি সবই আগের মতো আদায় চলছে। সরকার কিছুই দেখছে না।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু সমকালকে বলেন, মাউশি বলেছিল- সাতটি খাতে করোনাকালে অর্থ আদায় করা যাবে না। অথচ সমানে অর্থ আদায় চলছে জানুয়ারির শুরু থেকেই। বিষয়টি মাউশি দেখেও দেখছে না। তিনি বলেন, কোন খাতে কত টাকা নেওয়া যাবে, সেটি মাউশি নির্ধারণ করে দিতে পারত বছরের শুরুতেই। অভিভাবকরা তো জানেন না কোন শ্রেণিতে ভর্তি ফি কত আর পুনঃভর্তি ফিই বা কত। এই অভিভাবক নেতা বলেন, করোনাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর বিষয়ে ‘মানবিক’ আচরণ করার কথা সরকার বললেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।

আফরোজা জুলিয়া নামে এক অভিভাবিকা বলেন, সামনাসামনি পাঠদান না করিয়ে এভাবে টিউশন ফি আদায়ে বরং শিক্ষায় সংকট আরও বাড়বে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, করোনার খেসারত দিতে হচ্ছে শুধু অভিভাবকদের।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button