শিক্ষা

করোনার তাণ্ডব: শিক্ষাকার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি

করোনার তাণ্ডবে সমগ্র বিশ্ব যেখানে লন্ডভন্ড, আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমে তার কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না, তেমনটি আশা করা বৃথা। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ বাংলাদেশে শুরু হয় মোটামুটি ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে। নানারকম প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে যারা ২০২১ সালে পা রাখতে পেরেছেন, তাদেরকে সোভাগ্যবানই বলতে হবে। করোনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মেরুদণ্ড আক্রান্ত মানুষের জীবন যেমন বিপন্ন হয়ে ওঠে, তেমনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, জাতির অগ্রগতি থেমে যেতে বাধ্য। মানুষের জীবন এবং শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক। কাউকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। জীবন রক্ষার স্বার্থেই আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষার গতিধারা অনেকটা নদীর গতিধারার মতো। গতিশীল নদীতে যদি কোনো বাঁধ দেওয়া হয়, নদী তার গতি হারিয়ে ফেলে। নদী যখন তার গতিধারা হারিয়ে ফেলে, তখন সে আর নদী থাকে না, পুকুরে রূপান্তরিত হয়। একইভাবে আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমে যদি বাধাবিপত্তি দেখা দেয়, শিক্ষার গতি হারিয়ে যায়, মারাত্মক স্থবিরতা শিক্ষাকে গ্রাস করে ফেলে। করোনা আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমের গতিপ্রকৃতিকে কতটা বাধাগ্রস্ত করে তুলেছে সে দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে।

দেশ যখন ২০২০ সালের মার্চ মাসের দিকে করোনায় আক্রান্ত হয়, তখন কেউই ধারণা করতে পারেননি করোনা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। প্রথম দিকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধও ঘোষণা করা হয়েছিল সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুই মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় সবচেয়ে বিপদের সম্মুখীন হয় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে এ কথা ভেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় তারা অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চান। প্রথমে প্রস্তাবটি ইউজিসি কর্তৃপক্ষ আমলে নিতে চাননি, তবে আনন্দের বিষয়—অল্প সময়ের মধ্যেই ইউজিসি কর্তৃপক্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির দাবিটি অনুমোদন করেন। এর ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এটি ছিল ইউজিসি কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার অনুমতি না দিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম স্থবির হয়ে যেত। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যেত। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে গেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাত যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো, সে বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে ইউজিসির সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে।

করোনা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম চালু করা হয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে পঠনপাঠনের সুযোগ নিতে পারছে, অবশিষ্ট ২০/২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে মূলত এই সমস্যা বিরাজ করছে। নতুন প্রযুক্তির শুরুতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিতেই পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে ঐ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম চালানো যাচ্ছে বটে, তবে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বিষয়ে একটা জটিলতা থেকেই গেছে। তবে সে জটিলতার সমাধান করা যাবে না, এমন নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ারও ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে। সনাতন পদ্ধতির পরীক্ষা হয়তো নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তবে পরীক্ষা যদি হয় একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পরিমাপ করা, সেটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে অসম্ভব কিছু নয়। যতটুকু পারা যায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিমাপ করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

করোনার মধ্যে আমাদের জীবনের কার্যক্রম যেমন থেমে নেই, আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমকেও তেমনিভাবে চালিয়ে নিতে হবে। শিক্ষাকার্যক্রম যে এখনো গতিশীল রয়েছে তার কিছু উদাহরণ এখানে তুলে ধরতে পারি। বছরের শুরুতেই আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার যে রীতি চালু করা হয়েছে, করোনার তাণ্ডবে সে রীতির কোনোরকম হেরফের ঘটেনি। আমরা লক্ষ্য করেছি, ২০২১ সালের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, শিক্ষার কার্যক্রমে আমাদের গতিশীলতা অব্যাহত রয়েছে।

স্কুলকলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে একটি জটিলতা দেখা দেবে বলে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন ছিল। সেসব প্রশ্নেরও সুষ্ঠু সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। স্কুলে ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলেও লটারির মাধ্যমে ভর্তির যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে খবর পাওয়া গেছে। কলেজে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভর্তি হতে পারছে। কাজেই স্কুলকলেজে ভর্তির যে সমস্যা ছিল, সেসব সমস্যা এখন আর নেই বললেই চলে।

তবে ভর্তি নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল ঘোষিত না হলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভর্তিসংকট চলতেই থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক এবং নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল ঘোষিত হবে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে; কিন্তু ফলাফল ঘোষিত হয়নি। এ থেকে অনুমান করা যায়, ফলাফল ঘোষণায় জটিলতা দেখা দিয়েছে।

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের কোনোরকম পরীক্ষা না নিয়েই ফলাফল ঘোষণা করতে গেলে জটিলতা দেখা দিতে পারে তেমন একটি আশঙ্কা আমার ছিল। সে কারণে আমি দুই-একটি বিষয়ের পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছিলাম। আমার সে পরামর্শ ইত্তেফাকে একটি লেখার মাধ্যমে প্রকাশও করেছিলাম। শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ এলাকায় এখন পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। নিজ নিজ এলাকায় দুই-একটি বিষয়ের পরীক্ষা দিতে এমন কোনো সমস্যা হতো না। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তারা পরীক্ষা দিতে পারত। প্রকৃত সত্য এই—উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা ঘরে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এমন নয়, তারা প্রতিনিয়তই নিজ নিজ এলাকায় তাদের জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পাদন করছে, দুই-একটি বিষয়ে তারা অনায়াসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারত, কোনো অসুবিধা হতো না। এতে পরীক্ষার বিধি রক্ষিত হতো। যতদূর জানা গেছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব ঘটছে আইনের জটিলতার কথা ভেবে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের কোনোরকম পরীক্ষা না নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করলে সম্ভবত আইনের জটিলতা দেখা দেবে।

কোনোরকম পরীক্ষা না নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করলে কেউ আদালতে গেলে সমস্যা হতে পারে। কাজেই এ সমস্যার সমাধান না করে ফলাফল ঘোষণা করার মধ্যে বিপদ আছে। আমি যে দুই-একটি বিষয়ের পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলাম তা করলে অনেকটা সাপও মরত, লাঠিও বাঁচত প্রবাদের মতো হতো। এখন আর কিছু করার নেই। কাজেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা না নিয়ে যদি ফলাফল ঘোষণা করতেই হয়, সেক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে একটি অনুমোদন নিয়ে রাখলে আইনি কোনো জটিলতা থাকবে না। সম্ভবত সেই কাজটি করতে একটু সময় লাগছে। প্রত্যাশা করি, সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই সমস্যাটির সমাধান হয়ে যাবে।

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল ঘোষণার পরপরই উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। করোনাকালে ভর্তির প্রক্রিয়া যত সহজ করা যায়, সেদিকে সব মহলের দৃষ্টি দেওয়া বাঞ্ছনীয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির ব্যাপারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, দেশবাসীর কাছে এখনো বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তিব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি কিছু পরামর্শ আমার বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেছি।

ইউজিসি কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো ভেবে দেখলে বাধিত হব। আমাদের দেশের কোনো শিক্ষার্থী যাতে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে কথা ভেবেই দেশে এতসব কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। এই করোনার মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষা নেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। এক্ষেত্রে ইউজিসির দায়িত্ব হবে শিক্ষার্থীদের পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ঘোষিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সমবণ্টন করা। সমবণ্টনের দায়িত্ব ইউজিসি পালন না করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে কোনোরকম শৃঙ্খলা থাকবে না। তাতে শিক্ষার মানে বিঘ্ন ঘটবে।

উপসংহারে বলা যায়, করোনার ভয়ংকর তাণ্ডবের মধ্যেও আমাদের দেশের সব স্তরের শিক্ষার্থীর শিক্ষাকার্যক্রম যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা ইতিবাচক। আপত্কালে এর চেয়ে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা বোধ করি সমীচীন হবে না।

লেখক: সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button