নব্যদীপ্ত_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

‘২০ এর সমাপ্তিলগ্নে তারুণ্য

নতুন পাঠ্যপুস্তক নেওয়ার জন্য স্কুলের দিকে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে নতুন বছর শুরু করল আদনান। সে এবার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল, প্রাইভেট, বন্ধুদের সাথে আড্ডা-ঘোরাফেরা ; ভালোই চলছিল তার। চীনে নতুন ভাইরাস সংক্রমণের খবর ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জানুয়ারি মাসে স্কুলের বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস সম্পাদনের মাধ্যমেই ফেব্রুয়ারী উপস্থিত। এসএসসি পরীক্ষার জন্য সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলো ছুটি। ১ মাসের ও বেশি সময় পর স্কুল খুলতেই সেই কোভিড-১৯, করোনা ভাইরাসের বাংলাদেশে আগমনের খবর। মার্চের মাঝামাঝিতে লক ডাউনে বন্ধ হয়ে গেল সব কিছু। স্কুল-প্রাইভেট ছেড়ে নতুন এক ঘরবন্দী জীবনে আটকা পড়ল আদনান। অতঃপর?

প্রথম প্রথম ছুটির দিন ভালো লাগলেও আস্তে আস্তে বিরক্তিকর হয়ে যায় সবকিছু। সংক্রমণ হার বাড়ার সাথে সাথে সময়টা যেন ঘরের কোণে আটকা পড়ে যায়। ঈদের আনন্দও ঘরে বসে উদযাপন করতে হয় তার। এরই মধ্যে তার বাবা, একমাত্র উপার্যন উৎস, চাকরি হারিয়ে ফেলেন। তার হাসিখুশি পরিবার অন্ধকারের গর্তে প্যাঁচ খেতে শুরু করল। নানারকম চিন্তা আর ঘরবন্দী হতাশার কারনে পড়াশোনা থেকে সরে যেতে লাগল আদনান। এখন সে তার পরিবার নিয়ে বহুমুখী সংকটে পতিত।

২০২০ সালে তরুনদের তারুণ্য এক ভয়াবহ অবস্থা পার করছে। পড়াশোনা থেকে তারা দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিচ্যুত হয়ে আছে। স্বাভাবিক জীবন যাপন তাদের অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। সংকটের তাড়নায় তারা পূর্ববর্তী জীবনে অভ্যস্ত হতে পারছে না। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই সংকটকালে সর্বপ্রথম শিক্ষার্থীদের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল হয় এবং তারা অটোপ্রমোশন পায়। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং জে.এস.সি-জে.ডি.সি পরীক্ষার্থীদের অটোপ্রমোশন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দশম শ্রেণি ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষ বাদে সব শিক্ষার্থীদের অটোপ্রমোশন দেওয়া হয়। এখন এই মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল এর জন্য অনেক শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন।

সংকটের এই মুহুর্তে চাকরি হারিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে তারা তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে অপারগ হচ্ছেন। এর ফলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে আসছে অনেক শিক্ষার্থী। এজন্য শিক্ষার হার কমে যাবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই ব্যাবসায় ঋণের বোঝা মেটাতে অপারগ হচ্ছেন। মানষিক উত্তেজনায় স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এর মত ঘটনাগুলো বেড়ে যাচ্ছে। তাই করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর পাশাপাশি এধরনের ঘটনায় মৃত্যুর হার ও বেড়ে গেছে।

এরকম সময় একটি দৃশ্য মোটামুটি প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ছেলেমেয়েদের মোবাইল ফোন আসক্তি৷ রাতভর ঘুমের পরিবর্তে তারা ব্যবহার করে স্মার্টফোন। মেসেঞ্জার ফেসবুকে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করছে তারা। এতে তাদের মস্তিষ্ক পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আদনানের মত অনেক ভালো ছাত্র লেখাপড়া থেকে ঝড়ে পড়ছে। অনেকের বাবা মা সামর্থ্য হারিয়ে ফেলায় ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারছেন না৷ নিজের পারিবারিক অবস্থা অনেককেই লেখাপড়াবিমূখ করে তুলেছে।

কিন্তু আনন্দের বিষয় যে,অনেক ছেলেমেয়েই এ সঙ্কটকালে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে৷ যে সোস্যাল মিডিয়ায় অনেকে সময় অপচয় করছে, তারা সেখানে অনলাইনে বিভিন্ন ই-শপ চালুর মাধ্যমে উপার্যনের পথ বেছে নিয়েছে। বিষয়টি দেশে বেকারত্বের হার কমাতে অনেক কার্যকরী।

পরিশেষে দেখা যাচ্ছে যে, সঙ্কটের এই বছরে যেমন অনেক নেগেটিভ দিক উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি কিছু পজিটিভ দিকও মানুষের উপকারে আসছে। যেহেতু মহামারীর উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সুতরাং এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে হবে। তারুণ্য যে পরিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার জন্য এই সামান্য বুদ্ধি খাটিয়ে নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা জাগ্রত করতে হবে। এতে করে যেমন অনেকের সময় কাটানোর মাধ্যম তৈরি হবে, তেমনি অনেক অসচ্ছলের সচ্ছলতা তৈরি হবে। সব প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তারুণ্যের জয় হোক, এটাই আমাদের সকলের কামনা।
” সাগ্রহে অগ্রসর হও তবে সব তরুণ,
মোকাবিলা করো কঠিন সময়,
অবস্থা হোক যতই করুণ।
এগিয়ে যাও, দীপ্তি ছড়ায়ে, ছড়াও লাবন্য
জাগ্রত হোক সকলের মাঝে,
শুদ্ধ চিন্তার তারুণ্য।”

আবিদ হামজা
নব্যদীপ্তি_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button