নব্যদীপ্ত_শুদ্ধ চিন্তায় তারুণ্য

বাবা-মা’র ভুল সিদ্ধান্তে সন্তানের ভোগান্তি

একটি নীতিকথা আমরা মাঝেমধ্যে আমাদের গুরুজনদের মুখে শুনি, সেটা হল “বাবা-মা যা করে সন্তানের ভালোর জন্যই করে।” কথাটি কতটা সত্য? বাবা-মার সকল সিদ্ধান্তই কি সন্তানের মঙ্গল ডেকে আনে? এসব কথার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করার আগে চলুন কিছু উদাহরণ জেনে আসি আমরা।
আমার মা শিক্ষকতা করেন একটি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেই সুবাদে অনেক বাচ্চাকে কাছ থেকে দেখার এবং তাদের জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয় তার প্রতিদিনই। আমার মায়ের মুখেই শুনেছি তার একটি ছাত্রের জীবনের গল্প।

ছেলেটির নাম জিহাদ। বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সে। তার জীবনের শুরুটা হয়েছিল একটি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বাবা-মার বিয়ের পূর্ববর্তী সম্পর্কে ফলাফল ছিল সে তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তার বাবা তার মাকে বিয়ে করে। জন্ম হয় জিহাদের কিন্তু সে বাবা-মায়ের আদর বা সঙ্গ কোনটাই পায়নি বেশিদিন। জিহাদ জন্মানোর কিছুদিন পরেই তার মা আত্মহত্যা করে, অনেকে বলে মেরে ফেলা হয়েছিল তাঁকে তবে এর মৃত্যু আজও রহস্য থেকে গেছে। মা মারা যাওয়ার পরে বাবার কাছেও ঠাঁই হয়নি জিহাদের, পাঠিয়ে দেওয়া হয় নানীর কাছে। কিন্তু সদ্য হারানো কন্যাশোকে জিহাদের নানীও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন কিছুদিনের মধ্যেই। ছোট্ট জিহাদ বেড়ে ওঠে উঠতে থাকে তার নানা এবং সৎ নানীর কাছে।
একবার ভেবে দেখুনতো এই ছোট্ট জিহাদের দোষটা কি? কেন সে জন্মের পর থেকেই বাবা মায়ের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হল? কেন সে আজ এতিমের মতো খেয়ে না খেয়ে, অবহেলা, অনাদরে দিন পার করছে? উত্তর একটাই বাবা-মার করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করছে এই ছোট্ট ছেলেটা।

অনেকে বলতে পারেন ওরা তো অশিক্ষিত বাবা-মা ছিলেন, শিক্ষিত বাবা-মা কখনো ভুল করেনা সন্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। তাহলে এখন আসি দ্বিতীয় উদাহরণে।

আমাদের পাশের বাসার একটি মেয়ে জুথী, তার বাবা-মা দুজনই চাকুরীজীবী। সবসময় দেখেছি পড়াশুনায় দুর্দান্ত মেয়েটি। এসএসসি ও এইচএসসি দুইটাতেই এ-প্লাস পেয়ে পাশ করে সে। অনেক ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কিন্তু এইচএসসি পাশ করার পরেই একটি ভালো সম্বন্ধ আশায় অনেকটা জোরপূর্বকই তার শিক্ষিত বাবা-মা তার বিয়ে দিয়ে দেয়। যুক্তি হিসেবে তারা দেখিয়েছিল পরে যদি এমন ইঞ্জিনিয়ার ছেলে না পাওয়া যায় তাই এখনই বিয়ে দিয়ে দেই আর পড়াশোনা তো বিয়ের পরেও হয়।
তবে বাস্তবে আর বিয়ের পরে জুথীর পড়াশোনা হয়নি বরং সংসারে মন না দিয়ে পড়াশোনা করতে চাওয়ায় স্বামীর কাছে মার খেয়ে একবার হাসপাতলে ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে। পরে শুনেছি তার বিয়েটা নাকি টেকেনি, ছেলের চারিত্রিক সমস্যা ছিল।
আফসোস হয় যদি বাবা-মা একবার মেয়ের মতামতকে প্রাধান্য দিত, তাকে তার জীবন নিয়ে ভাবার সুযোগ দিত, পড়াশোনা করার সুযোগ দিত তাহলে হয়তো জুথীর জীবনের এই নির্মম পরিণতি হতো না।

এরূপ হাজারো ঘটনা আমরা দেখতে পাই একটু চোখ-কান খোলা রাখলে। বাবা-মায়ের ভুল সিদ্ধান্তে অকালে হাজারো সন্তানের জীবন ঝরে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়। তাহলে কিভাবে “বাবা-মা’র সকল সিদ্ধান্তই সন্তানের মঙ্গলের জন্য” এই কথাটির উপর বিশ্বাস রাখা সম্ভব?

প্রত্যেক বাবা-মার কাছে আমার অনুরোধ, দয়া করে আপনাদের সকল সিদ্ধান্ত সন্তানের উপর চাপিয়ে দিবেন না। নিজেদের ভুলের জন্য সন্তানের জীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবেন না। সন্তানের মতামতকেও প্রাধান্য দিন, তাদের কথা শুনুন একটু বুঝুন।

বর্তমান প্রজন্ম থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের সকল প্রজন্ম একটি সুস্থ- সুন্দর পরিবেশে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটাক এবং তার সূচনা হোক নিজের পরিবার থেকে- এটাই আমাদের কাম্য।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button