তারুণ্যের কন্ঠস্বর

শিরিন মেয়ে হলেও তো মানুষ- পারিবারিক সহিংসতা

সেই প্রাচীনকাল থেকে নারী সহিংসতা নামক বিষয়টি পুরোনো ব্যধির মতো আমাদের সমাজে জেকে বসেছে। সভ্যতার সবকিছু উন্নতির দিকে অগ্রসর হলেও এখনও কিছু মানুষের মানসিকতা উন্নত হয়নি।  একবিংশ শতাব্দীতে পৌছেও আমরা নিজেকে পরিবর্তন করতে পারিনি।তাইতো এখনও একটি মেয়েকে পরিবার, সমাজ, কর্মস্থল ও রাস্তাঘাটে বিভিন্নভাবে সহিংসতার স্বীকার হতে হয়। আজ এমনই এক মেয়ের কথা আপনাদের বলবো।

ফাতেমা খাতুন শিরিন। লোকে তাকে শিরিন বলেই ডাকে।রাজধানীর অদূরে এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত  পরিবারে ছোট্ট একটি কুটিরে জন্ম তার। সাধারণত কারো বাসায় ছোট বাচ্চা আসলে পরিবারের মুখে হাসি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু, সে রাতে সকলেরই মুখ যেন অন্ধকার ছিল। তাদের চেহারায় আফসোস ও বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। তাদের সন্তান হিসেবে যে একটি মেয়ে হয়েছে এ কথা তারা কিছুতেই মানতে পারছিল না। এবং বিধাতার অভিশাপরূপেই যে এই মেয়ে তাদের ঘরে এসেছে এ বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ ছিল না।

যতই দিন যাচ্ছিল শিরিন যেন ততই সকলের দু-চোখের বিষে পরিণত হচ্ছিল। সেখানে কেউ তাকে সহ্য করতে পারতো না। পরিবারের সকলের কাছেই সে অতি অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক বোঝা ছিল। সে ঘরের একটি কোণে পড়ে থাকতো, ঘরের উটকো জিনিস হিসেবে। যার প্রতি দৃষ্টি বা মনোযোগ দেওয়ার মতো অতো আজাইরা সময় কারো ছিল না। সে কেমন আছে, তার কোনোকিছু প্রয়োজন কিনা সেসব বিষয়ের খেয়াল পরিবারে কেউ রাখতো না।

এই অবহেলার মধ্য দিয়েই শিরিন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। তবে সকলে তাকে অবহেলা করলেও একজন মানুষ ছিল যে তাকে ভালোবাসতো, তাকে আদর করতো। তিনি ছিলেন শিরিনের মা। যতো যাই হোক নিজের সন্তানকে তো আর ফেলে দিতে পারেন না।তিনি পরিবারের কড়া শাসনের মাঝেও যখনই সময় পেতেন শিরিনের দেখাশুনা,তার যত্ন-আত্মি করতেন। কিন্তু বাড়ির কাজের মহা-ঝামেলার মাঝে এ কাজগুলোর জন্য তিনি প্রায়ই সময় পেতেন না।

পরিবারের মাঝে সে সবসময়ই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতো। তাকে কোনো কিছু দেওয়াই পরিবারের মানুষ অতিরিক্ত মনে করতো।তাই, সে পরিবার থেকে খুব বেশি কিছু পেতনা। তার খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক সবকিছুর বেপারেই পরিবারের মানুষের খুব অনিহা ছিল। তাকে কিছু দেওয়া আর গঙ্গায় ফেলে দেওয়া পরিবারের কাছে এক জিনিস ছিল। এমনকি বাড়ির প্রায় সব ভারী কাজ শিরিনকেই করতে হতো। যদি কখনো কোনো কাজে ভুল হতো বা সে কাজটি করতে না পারতো তবে তাকে অনেক কথা শুনতে হতো। এবং কখনো কখনো মারও খেতে হতো। কিন্তু কাজটি তাকে দেওয়ার আগে কেউ একবার এটা ভাবতো না যে ছোট্ট শিরিন এ কাজটি করতে পারবে কিনা।

এই পরিবারে তার কোনো স্বাধীনতা ছিল না।কোনো বিষয় সম্বন্ধে তার কথা বলা বা মতামত দেওয়া ছিল সম্পূর্ণরূপে বারণ। এখানে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। নিজের স্বপ্নের পাখায় ভর করে খোলা আকাশে অচিন গন্তব্যে উড়ে যাওয়া তার জন্য ছিল চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই বিরল। এমনকি ক্লাস এইট পাশ করার পর যখন সে সাহস সঞ্চার করে তার পরিবারকে বলেছিল সে আরও পড়তে চায়। নিজের পায়ে দাড়িয়ে সমাজের জন্য কিছু করতে চায় তখন তাকে অনেক নিগ্রহ ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল ” মেয়ে মানুষ এত পড়ে কি করবে।যা পড়িয়েছি তাতেই অনেক। মেয়ে মানুষের বাইরে যাওয়া সাজে না। তার জগৎ এই চার দেওয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ”

শিরিনের জীবন এভাবেই প্রতিটি মূহুর্তে হাজারো নির্যাতন, অবহেলা ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটে যাচ্ছিল। সে পরিবারের অভিশাপ হয়েই ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকতো। বাস্তবতা ও নির্মমতার আড়ালে তার ইচ্ছা তার স্বপ্নগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে খোলা আকাশের নিচে তার যন্ত্রণা, তার অভিযোগগুলো চিবুক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়তো। কিন্তু তার সেই নির্বাক আর্তনাদ কারো কান পর্যন্ত পোছাইতো না।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button