জাতীয়

টিকায় অগ্রাধিকার পাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্করা

দেশে করোনা প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার অগ্রাধিকার তালিকা করছে সরকার। পাশাপাশি টিকা সংরক্ষণ ও বিতরণে আলাদা প্রকল্প নিয়েও কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অবশ্য বাংলাদেশ কোন কোম্পানির টিকা আগে পাবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। তবে দ্রুত টিকা পেতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছেন চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। এর পরই দেশের বয়স্ক নাগরিকদের অগ্রাধিকারে রেখেছে সরকার। বয়স্ক বলতে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ধরা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এই বয়সীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এর পরই মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মী অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাঠ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসনসহ নানা শ্রেণি-পেশার জনগণ থাকবেন। টিকা পাওয়া সাপেক্ষে এরপর অন্য নাগরিকদেরও দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, কোন ধরনের নাগরিকদের আগে টিকা দিতে হবে সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দিকনির্দেশনা থাকবে। ইতোমধ্যে কিছু আলোচনা হয়েছে। ওই দিকনির্দেশনার আলোকে দেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে নিজেদের অগ্রাধিকার তালিকা ঠিক করা হবে। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্তরা অগ্রাধিকারের শীর্ষে থাকবেন। এর পরই থাকবেন বয়স্করা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়স্ক বলতে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের বয়সী নাগরিকদের বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে গড় আয়ুসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের বয়স্ক নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওয়ার্ড পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বয়স্ক নাগরিকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভ্যাকসিনের কোল্ডচেইন (টিকা সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা) বজায় রাখতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

করোনা প্রতিষেধক টিকা কিনতে ইতোমধ্যে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। এ সংস্থার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকার তিন কোটি ডোজ কিনবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী জানুয়ারি থেকে ছয় মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে তিন কোটি ডোজ পাওয়ার আশা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

প্রতিজনকে দুই ডোজ করে টিকা দিতে হবে, তাতে প্রথম দফায় দেড় কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। ২৮ দিনের ব্যবধানে দুই ডোজ করে দেড় কোটি মানুষকে দেওয়া হবে। তিন কোটি টিকার দামের অর্ধেক ৬৩৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ইতোমধ্যে সিরাম ইনস্টিটিউটকে আগাম পরিশোধ করতে ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর টিকার কোল্ডচেইনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ৩১৮ কোটি টাকা চেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয় এ খাতে ১০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, টিকা সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা, টিকা কারা কখন পাবেন, কারা দেবেন, যারা দেবেন তাদের প্রশিক্ষণ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কীভাবে টিকা পৌঁছানো হবে ইত্যাদি বিষয়কে সম্পৃক্ত করে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল এ বিষয়ে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে।

জানা গেছে, এক বছর মেয়াদ ধরে ৩০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি অর্থ দাতা সংস্থা থেকে নেওয়া হবে। টিকা সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার বর্তমানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তার মাধ্যমেই করোনাভাইরাসের টিকা পাওয়া গেলে সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হবে।

এ ক্ষেত্রে যেসব ত্রুটি ও দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঠিক করা হবে। কারণ টিকা ল্যাবে উৎপাদনের পর বিমানে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে। বিমান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে প্রত্যেকটি দেশের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সেন্ট্রাল মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট বা সিএমডিতে এসব টিকা সংরক্ষণ করা হবে। এখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হবে আঞ্চলিক টিকা সংরক্ষণ কেন্দ্রে। সেখান থেকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যাবে। হাসপাতাল থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়ে নাগরিকদের টিকা দেবেন।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, বিপুল পরিমাণ টিকা সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্তমানে প্রচলিত টিকাগুলো সংরক্ষণ ও সরবরাহের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা-ই যথেষ্ট।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে সব সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সারাদেশে থাকা সরকারি চাকরিজীবীদের একটি তালিকা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রতি ওয়ার্ডে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা তার ওয়ার্ডের কাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তার তালিকা করছেন।

বয়স্ক নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখ বিবেচনায় নিয়ে এ তালিকা করা হবে। তালিকা তৈরির পর নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এরপর কাকে, কবে টিকা দেওয়া হবে সেই দিন তারিখ উল্লেখ করে প্রত্যেককে একটি করে স্লিপ বা কার্ড দেওয়া হবে। প্রত্যেকে ওই কার্ডে উল্লেখ করা তারিখে টিকা পাবেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ ৬০ বছরের বেশি বয়সী। এ হিসাবে দেশে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ ষাটোর্ধ্ব বয়সী। তবে তারা সবাই একসঙ্গে টিকা পাবেন না।

সম্পর্কিত পোস্ট

হাইলাইট
Close
Back to top button