তারুণ্যের কন্ঠস্বর

অন্ধকারের ছোবল ও একজন রিদিমা

রিদিমা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী!! মধ্যবিত্ত পরিবারের আর পাঁচটা মেয়ের মতই তার জীবন। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। বই পড়া শখ তার। আর প্রতিদিন বিকেলে নিজ এলাকার ই একজন বান্ধবীর বাসায় সে সময় কাটাতে যায়। সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরে আসে।

কিন্তু সেদিন সূর্যাস্তের পর দুই ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও বাড়ি ফিরল না সে। ছোট ভাই আর মা-বাবা অসহায়ের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। হঠাৎ রাস্তার পাশের ফুটপাত দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখা গেল তাকে। উস্কো-খুষ্কো চুল ; জামাকাপড় এলোমেলো। মুহুর্ত দেরী না করে বাড়িতে এসে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল সে। বেশ কিছুক্ষণ পর বের হয় সে, বাবা-মার প্রশ্নের জবাবে সত্যি কথা বলতে হয় তাকে। সে কথাগুলো প্রতিবেশীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল— ‘ধর্ষিতা মেয়ে ‘ উপাধি দেওয়া হলো তাকে। বাবা-মাও কেমন জানি তাকে দোষারোপ করতে শুরু করল। হাজারো মানষিক চাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বেছে নিলো সে আত্মহত্যার পথ।

সাম্প্রতিক কালে আধুনিক সমাজের অত্যাধুনিক খবর হলো ‘ধর্ষণ’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি এখন বহুল আলোচিত বিষয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার পর এটি এখন টপ টপিক হয়ে দাড়িয়েছে। ধর্ষকদের নির্যাতন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের এমন ব্যাবহার পশুত্বকেও হার মানিয়ে ফেলছে।

রিদিমার মত অসংখ্য নারী প্রতিবছর ধর্ষনের স্বিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের ৩৫% নারী এ ধরনের ঘটনার স্বিকার হয়। দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী প্রতিবছর ধর্ষন ও অন্যান্য নির্যাতনের স্বিকার হয়। এভাবে দেশের বিপুল সংখ্যক নারীর অগ্রগতিকে পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন আশা করা এক প্রকার বোকামি।

এরকম রিদিমারা হলো জাতীর ভবিষ্যত। যদি এভাবে একের পর এক রিদিমা ধর্ষিত হয়, তবে জাতীর ভবিষ্যত কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে? একটা হতাশাগ্রস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে জাতির উন্নয়ন আশা করা যায় না। নারীর প্রতি এভাবে সহিংসতা হতে থাকলে দেশ আর্থ সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিগত বছর গুলোর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ সালে ধর্ষনের স্বিকার হন ২১৮ জন নারী।এর মধ্যে আত্মহত্যা করেন ১৮ জন। ২০১৭ সালে ৮১৮ এবং ২০১৮ সালে মোট ৭৩২ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়(১৪১৩ জন)। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয় ৭৬ জন নারীকে এবং আত্মহত্যা করেছে ১০ জন। এছাড়া ৪৪ জন পুরুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নানা ভাবে নির্যাতনের শিকার হন।

ধর্ষনের পর রিদিমার মত আত্নহত্যার ঘটনাটিও দিন দিন বেড়ে চলেছে। পারিবারিক সমর্থনের অভাবে আত্মহত্যা করে এসব অসহায় মেয়েরা। ধর্ষিতা নারী তো স্বেচ্ছায় ধর্ষিত হয় না, তাই সকলের উচিত তাদের পাশে থাকা। সবার থেকে না হোক, অন্তত পরিবারের থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য বা সাপোর্ট না পাওয়ায় আজ শত শত রিদিমা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

প্রতিবেশীদের অযাচিত কথাবার্তা তাদের ডিপ্রেশনের অন্যতম প্রধান কারন। প্রতিবেশীদের এসব সমালোচনা রিদিমার মত টিন-এজার রা ঠিক গ্রহন করে নিতে পারে না। আত্মসম্মানের জন্য তারা ঘরের কোনে ডুকরে ডুকরে মরে। সামান্যতম নির্মলতার ছোয়া পেলেই এসময় তারা স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হতে পারে।

ধর্ষণের প্রধান কারন নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। ছেলেবেলা থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাবে ছেলেমেয়েরা বিশেষ করে ছেলেরা নানা রকম অনৈতিক কাজ করে। বাবা-মা’র অবাধ্যতা, পাশাপাশি মেয়েদের অশালীন পোশাক-পরিচ্ছদ, অনৈতিক প্রস্তাবে অস্বিকৃতি ইত্যাদি কারনে রিদিমার মত মেয়েরা নেশাগ্রস্ত, মাদকাসক্ত হায়েনাদের কবলে পরে অকালে প্রান দিয়ে দেয়।

সম্প্রতি গন আন্দোলনের চাপে দেশের নারী নির্যাতন-ধর্ষণ আইন সংশোধন করা হয়েছে। শুধু আইন প্রনয়ন করে এর সমাধান সম্ভব না। সামাজিক সচেতনতা তৈরি করে, মেয়েদের শালীনতা মেনে চলা ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রচারের মাধ্যমে এর প্রকোপ কমানো সম্ভব বলে আশা করা যায়। এধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। ‘২৫ শে নভেম্বর’ কে স্বিকৃতি দেওয়া হয়েছে ‘ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। তবে শুধু নির্দিষ্ট দিনে এর কার্যক্রম সচল রাখলে হবে না, বছরের প্রতিটি দিনকেই নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে গ্রহন করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা ও মূল্যবোধ ই পারে রিদিমার মত মেয়েদের ধর্ষণ ও অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে।

‘তবে দূরীভূত হোক অন্ধকার
বেজে উঠুক নির্মলতার গান,
উজ্জীবিত হোক নতুন দিনের আলো
রিদিমাদের যেখানে দিতে হবে না প্রান।’

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button
error: Content is protected !!