মুক্তিযুদ্ধ বগুড়া

বগুড়া জেলার ভাষা সৈনিক মরহুম গাজীউল হক এর জীবন চরিত

ভাষা সৈনিক মরহুম গাজীউল হক সালের ফেব্রুয়ারি ১৩, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ৷ পিতাঃ মরহুম মওলানা সিরাজুল হক (কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী) এবং মাতাঃ মরহুমা নূরজাহান বেগম (গৃহিণী) ছিলেন।

গ্রামের মক্তবে তিনি তাঁহার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন এবং পরবর্তী তিনি কাশিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন; উক্ত বিদ্যালয়ে হতে তিনি উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বগুড়া জিলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। বগুড়া জিলা স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি, শিক্ষক সুরেন বাবুর সান্নিধ্যে দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন।

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন; এরপর তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আই.এ শ্রেণীতে ভর্তি হন।
উক্ত শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন অবস্থায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ ভাষা বিজ্ঞানী মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে এসে বাম রাজনীতির সহিত সম্পৃক্ত হন।
১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্সে যোগ দেন।

তিনি ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত আসাম মুসলিম লীগ কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়ে মাওলানা ভাসানীর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং নেতৃত্বে আকৃষ্ট হন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগের ঈশ্বরদী কনফারেন্সে উত্তরবঙ্গ শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৬,৭ সেপ্টেম্বর,১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় গণতান্ত্রিক যুবলীগের দুদিনব্যাপী কর্মী সম্মেলনে তিনি বগুড়ার পাঠচক্র ‘শিল্পায়নে’র সদস্যদের সঙ্গে অংশ নেন।

ভাষা সৈনিক মরহুম গাজীউল হক ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তৎসময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইয়ের সংগ্রাম শুরু হয়। মার্চ ১১, ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে গাজীউল হক বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে ছাত্রদের মিছিল নিয়ে বগুড়া শহর প্রদক্ষিণ করেন এবং বগুড়া জিলা স্কুল ময়দানে অনুষ্ঠিত সভায় যোগদান করেন। উক্ত সভার সভাপতি হিসেবে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাকে রাষ্ট্র্রভাষা করার দাবির স্বপক্ষে দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুক্তি ও তথ্য নির্ভর ভাষণ দেন।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে গাজীউল হক বগুড়া কলেজ থেকে আই.এ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অর্নাস বিষয়ে ভর্তি হয়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ওঠেন। তৎসময়ে তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কারাবরণ করেন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন-বেতন কর্মচারীগণ ধর্মঘট আহবান করলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনি উক্ত দাবী সমর্থন করেন।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি ভুখা মিছিল বের হয়; উক্ত মিছিলে গাজীউল হক শরিক হন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ অর্নাস ডিগ্রী লাভ করে এম.এ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এম.এ শ্রেণীতে ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, বির্তক প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন; কিন্তু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাঁর এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেয়। পরবতীতে ছাত্রনেতা ইশতিয়াক, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান প্রমুখের প্রচণ্ড আন্দোলনের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর এম.এ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়।
১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন; ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একসঙ্গে ১১ বিষয় আইন পরীক্ষা দেন এবং কৃতকার্য হন ।

ভাষা আন্দোলনে ভুমিকাঃ
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম গঠিত হলে আব্দুল মতিন এই কমিটির আহ্বায়ক হন। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস ঘোষণা করে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে পল্টনের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্র হলে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়।

ঘোষণানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠানে গাজীউল হক অংশ নেন এবং সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য মন্ত্রী নূরুল আমীনের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছিল উত্তাল। এ আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে রাজপথে সবখানে। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংযের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে একুশে ফেব্রুয়ারী সকাল ৯ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকে। সকাল ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়।

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়। উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়।

অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কন্ঠে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” এই দাবীতে আন্দোলন

তথ্যসুত্র- গোলাম জাকারিয়া কনক

সম্পর্কৃত পোস্ট

error: Content is protected !!
Close
%d bloggers like this: