তারুণ্যের কন্ঠস্বর

মহান একুশ ও একুশে বইমেলা – হিমেল আহমেদ

মহান একুশ ও একুশে বইমেলা

বিজ্ঞাপন
ফেব্রুয়ারি মাস বাঙ্গালী জাতির কাছে অতীব গুরুত্ববহ আমি মনে করি। কেননা এই মাসে একসাথে অনেক কয়টি উৎসব আমরা উৎযাপন করি। ভালবাসা দিবস, ভাষা দিবস, বইমেলাসহ বিভিন্ন উৎসব। হ্যা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা আধুনিক হয়েছি। তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে নিজস্ব সংস্কৃতি ক্রমেয় ক্ষয় হচ্ছে। বর্তমানে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপের যুগে মানুষ বই পড়তে অনাগ্রহী। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের অলস করে দিয়েছে। বিশেষ এক প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেই নিজের অস্তিত্ব খুজতে ব্যস্ত! তবুও ব্যস্ততম এই সময়ের কাছে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি  বই।

আজকাল জ্ঞান আহরণের বিবিধ মাধ্যম জন্ম নিয়েছে। সার্চ ইঞ্জিন গুগল বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। তাই হয়ত বই ক্রমশ বিলুপ্ত পর্যায়ে যাচ্ছে। বাঙ্গালীজাতি নিজের সত্বা কে ঠিকই টিকিয়ে রাখতে জানে। যা প্রমান হয়েছিল এই ফেব্রুয়ারি মাসেই। ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথ যাদের রক্তে স্নান করেছিল তাদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে কি? যুগ যুগান্তর ধরে এই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সারাদেশে বইমেলার আয়োজন করা হয়। যা বাংলাদেশের একটি অন্যতম উৎসব। এই বইমেলা মনে করিয়ে দেয় ৫২’র ভাষা আন্দোলনের বীরত্বের কথা। শ্রদ্ধেয় সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার,শফিউর সহ নাম না জানা শহিদদের আত্বত্যাগের কথা।

তাৎকালিক পরাধীন বাংলাদেশে বাঙ্গালী জাতির রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করার লক্ষে শহীদগন যে সাহসিকতা ও ভালবাসা দেখিয়ে গেছেন তা কখনো ভোলার নয়। তাই আলতাফ মাহমুদের মত গাইতে ইচ্ছে করে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমি কি ভুলিতে পারি?” এই গান শুধু মাত্র একটি সঙ্গীত নয়। এই গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ৫২’র পটভূমির ইতিহাস।  এই গানের কথায় ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ফুটে উঠেছে।

সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে গানটি রচনা করেন। প্রথমে আবদুল লতিফ গানটি সুরারোপ করেন। তবে পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদের করা সুরটিই অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে, ১৯৫৪ সালের প্রভাত ফেরীতে প্রথম গাওয়া হয় আলতাফ মাহমুদের সুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি এবং এটিই এখন গানটির প্রাতিষ্ঠানিক সুর। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তাঁর জীবন থেকে নেওয়া চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে বর্তমানে এই গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়। আজ আমরা স্বাধীন জাতি বলে বিশ্বের কাছে গর্ব করে বলতে পারি। আর আমাদের এই স্বাধীনতার প্রারম্ভিকতা তো একুশ থেকেই পাওয়া। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে গিয়ে বাঙ্গালী যে লড়াই করে নিজের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে তার সুত্রপাত ঘটেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকেই। তাই ফেব্রুয়ারি মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য। ৫২ সাল থেকেই প্রতিবছর এই দিনটি শোক এবং শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে পরিবর্তীতে ১৯৭১ এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ ও মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।তবে ২০১০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হচ্ছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি যতটা গুরুত্ববহ ততটা একুশে বইমেলাও প্রতিটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ছাড়াও কলকাতা তেও ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে বই মেলার আয়োজন করা হয়। এই বইমেলার ইতিহাস খুজতে গিয়ে জানলাম স্বাধীনতার মতই এই একুশে বইমেলার ইতিহাসও প্রাচীন। স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার সুচনা করেন। এই ৩২টি বই ছিলো চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা বই।এই বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান হিসেবে বিবেচিত ।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান ক্রমানয়ে ১৯৭৬ সালে অন্যান্যরা অণুপ্রাণিত হোন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমীকে মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি; এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম “অমর একুশে গ্রন্থমেলা”র আয়োজন সম্পন্ন করেন। সেই থেকে আজও অবধি বই মেলার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।বই মেলার মাধ্যমে লেখক-পাঠকের সম্পর্কের সমন্বয় ঘটছে। অমর একুশ ও একুশে বইমেলা পরস্পর নিবীরভাবে জড়িত। যা বাংলার সাংস্কৃতিক সাহিত্যকে জাগিয়ে রাখে আর আমাদের পরস্পরকে এক সেতুবন্ধনে আকড়ে রাখে। একুশ বারবার ফিরে আসুক, ফিরে আসুক এই বইমেলাও।  আর দিয়ে যাক আমাদের স্বাধীনতার একগুচ্চ অনুপ্রেরণা। ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদদের প্রতি রইল শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা।

লেখকঃ

হিমেল আহমেদ

কলামিস্ট,সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

বগুড়া।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button