মুক্তিযুদ্ধ বগুড়া

বগুড়া জেলার প্রথম শহীদ ছাত্রনেতা,চিশতি শাহ হেলালুর রহমান

শহীদ চিশতি শাহ হেলালুর রহমান ৫ মে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া জেলার সদর উপজেলাধীন রহমান নগর মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাহাঁর পিতাঃ মরহুম চিশতি মনসুর রহমান ও মাতাঃ মরহুমা সাজেদা খাতুন। মাতা-পিতার দুই পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের মধ্য তিনি জৈষ্ঠ্য ছিলেন।

শিক্ষাজীবনঃ
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিক ও ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে আইএ পাস করেন। অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (দর্শন শাস্ত্রে) ভর্তি হন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে থেকে বিএ (অনার্স) পাস করেন এবং এমএ (ইতিহাস) বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (তৎকালীন ইকবাল হল)-এ থাকতেন।

রাজনীতি এবং সাংবাদিকতাঃ
শহীদ চিশতি শাহ হেলালুর রহমান ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিশিষ্ট কর্মী ছিলেন। তিনি উনসত্তর-এর গন-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক (১৯৭০-৭১) ছিলেন। কবি নির্মলেন্দু গুন তার “আত্মকথা ১৯৭১” গ্রন্থে লিখছেন- শহীদ চিশতি শাহ হেলালুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর মতোই সাদা কাপড়ের পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়ত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আরও একটা মিল ছিল, তিনি মোটা কাল ফ্রেমের এবং খুব ভারী কাচের চশমা পড়তো। বঙ্গবন্ধুর মতই চিশতিও ছিল গ্লুকোমার রোগী। চুলের মাঝখান দিয়ে সিথি করতো বলে খুব সহজেই আলাদা করে চেনা যেত। সর্বদাই হাসিমুখে থাকতো। আমরা (কবি) শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আড্ডা দিতাম। “‘

শহীদ চিশতি শাহ হেলালুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাফ রিপোর্টার (১৯৭০-৭১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের পাঠাগার সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

তিনি একাত্তরের ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সেনা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, তাঁর সহপাঠী (বাংলা একাডেমির সাবেক কর্মকর্তা মফিজুল ইসলামের) ‘আমার বন্ধু’ রচনা থেকে- তিনি লিখেছেন, “পঁচিশ মার্চ একাত্তরে পঁচিশে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে তখন চিশতী দোতলায় ওর জানালার পাশের হল আর অডিটোরিয়ামের মাঝামাঝি শেডটির ওপর লাফিয়ে পড়ে। সারাটা রাত ওই শেডের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকে চিশতী। জীবনমৃত্যুর লড়াই হলো সারারাত।‘পূর্বের আকাশ ফরসা হয়ে গেছে। সারারাত গুলিবর্ষণের পর পাকিস্তানী হায়েনাদের যন্ত্রগুলো তখন নিশ্চুপ। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েছে, চিশতী হয়তো তাই ভেবেছিলো।

হানাদার বাহিনীর কেউ কোথাও আছে কিনা দেখার জন্য চিশতী যখন মাথাটা সামান্য উঁচু করলো, ঠিক তখনই খালেকের দোকানের সামনে পাহারারত হানাদার কুকুরটা তেড়ে এলো।
‘নুরু নামের এক রিক্সাওয়ালাকে লাশ কুড়িয়ে এক জায়গায় জমা করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছিল। চিশতী শেডের ওপর থেকে লাফ দিতে চাইলে ও বাধা দিয়ে বললো, “পাইপ বেয়ে নেমে আসুন স্যার, লাফ দিবেন না।” হলের সামনে পুকুরের পাশেই ছিল মেজর। তার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো চিশতীকে।

হলের পাশের দোকানদার খালেক, চিশতীর মৃত্যু সম্বন্ধে আমাকে জানায়-চিশতী নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
দৈনিক আজাদের রিপোর্টার হিসেবেপরিচয় পেশ করে কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নাই। হলের পিছন-দিক থেকে ডাইনিং হলের দিকে যেতে যে সরু রাস্তাটা—তারই পাশে ড্রেনের কাছে গাছের নীচে দাঁড় করিয়ে পর পর তিনটি গুলি করা হয়। প্রথম গুলিটি যখন ওর বুকের বামপাশ ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখনই তিনি “জয় বাংলা” বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন।


তথ্যসূত্রঃ
১. আত্মকথা-১৯৭১
২. আমার বন্ধু- মফিজুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির সাবেক কর্মকর্তা।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button