বগুড়া সদর উপজেলাবগুড়ার ইতিহাসমুক্তিযুদ্ধ বগুড়া

স্বাধীনতা যুদ্ধে বগুড়া জিলা স্কুল দখলের সময় পতাকা উত্তোলনের ইতিহাস

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বগুড়া জিলা স্কুলের অবদান ছিল অসীম। যুদ্ধের প্রাক্কালে জিলা স্কুল ক্যাডেট কোর এর ২৮ টি রাইফেল নিয়ে স্কুল মাঠে কুমিল্লা থেকে আগত এক হাবিলদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে বগুড়া জিলা স্কুলের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র শিক্ষকগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদের মধ্যে জীবন উৎসর্গ করে শহিদের মর্যদা লাভ করেন চিশতী হেলালুর রহমান, গোলাম মোহাম্মদ পাইকাড় খোকন, শহিদ টি. এম. আইয়ূব টিটু, শাহ আব্দুল মমিন হিটলু, সাইফুল ইসলাম, মাসুদ আহম্মেদ মাসুদ, টিপু ও দোলন।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি স্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলে এই স্কুলে। শিক্ষকগণ স্কুল শেষে গ্রামে ফিরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ক্যাম্পের খবর সরবরাহ করতেন। বগুড়া জিলা স্কুলের কৃতি ছাত্র মেজর (অবঃ) এ. টি. এম. হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রম, পিএসসির নেতৃত্বে ভারতের গুর্খা বাহিনীর সহযোগিতায় বগুড়া জিলা স্কুলকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

তারেক সাহেব এর উপর দায়িত্ব ছিল ৫/১১ গুর্খা রেজিমেন্ট কে গাইড করা, যারা বগুড়া রেল স্টেশন দখল করার পর সাতমাথায় ৬ গার্ড রেজিমেন্ট, ২/৫ গুর্খা রেজিমেন্ট, ও ৪ মাদ্রাজ রেজিমেন্ট এর সাথে মিলিত হবে।

৫/১১ গুর্খা রেজিমেন্ট ও তারেক সাহেব রা সান্তাহার রোড থেকে ট্যাঙ্কের বহর কে পূর্ব দিকে ঘুরিয়ে সান্তাহার-বগুড়া রেল লাইন ডানে রেখে রেল লাইন বরাবর সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলল। ডিগ্রী কলেজের দেড় দুই হাজার গজ দূরে থাকতেই ডিগ্রী কলেজ ও স্টেশন এলাকায় পজিশনরত পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়। ফাইটার প্লেন থেকে বোমা ও মাটি থেকে ট্যাঙ্ক এর গোলার আক্রমণে দিসেহারা হয়ে পাক সেনারা পজিশন ছেড়ে পালায়। এরপর রেল স্টেশন দখল করে সাতমাথার দিকে অগ্রসর হতেই পাক স্নাইপার আক্রমণের সম্মুখিন হয় তারা। দূরবীন এর সাহাজ্জে স্নাইপার পজিশন খুঁজতে লাগলো। সাতমাথার হাবিব ব্যাংক এ নড়াচড়া চোখে পড়তেই ট্যাঙ্কের নল ঘুরিয়ে ফায়ার করা হোল। হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পরল বাঙ্কের পাকা দেওয়াল। এর পর তারেক সাহেবের চোখে পরল জিলা স্কুলে দোতলায় ছাদের কোনায় কি যেন ঝিকঝিক করছে। বোঝা গেল ওটাই স্নাইপার পজিশন। ট্যাঙ্কের নল ঘুরিয়ে স্নাইপার পজিশনে ফিক্স করা হোল। ফায়ার করার সব প্রস্তুতি শেষ। এবার কমান্ডারের আদেশের অপেক্ষা……এরপর শুনুন হামিদুল হোসেন তারেক (বীর বিক্রম) এর মুখে …

হঠাৎ আমার মনে হোল, আরে এটা তো আমার স্কুল। যে স্কুলে আমি ছোটবেলা থেকে লেখাপড়া করে ম্যাত্রিক পাস করেছি। এখন ট্যাঙ্কের ফায়ার করলে স্কুল বিল্ডিং পুরো ভেঙ্গে পরবে। হারিয়ে যাবে আমার শৈশব স্মৃতি। আমার ভেতর টা একটা অজানা বেদনায় মুচড়ে উঠলো। আমার মন বলল – না আমি থাকতেএটা করতে দেওয়া যাবে না। এটা হয় না। আমি চিৎকার করে দু হাত আকাশের দিকে তুলে ট্যাঙ্ক কমান্ডার পিতওয়ার কে বল্লাম –- স্যার প্লিজ ডোন্ট ফায়ার।- “হোয়াই ?” উনি অবাক হয়ে বললেন।- দিস ইস মাই স্কুল। আই অ্যাম এ এলমার ম্যাটার। আই লাভ মাই স্কুল।উনি অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন এর পর হেসে বললেন – “আই গট ইয়োর সেন্টিমেন্ট। ও. কে. স্টপ ফায়ার।”এতক্ষনপর আমার বুকের ভেতর জমিয়ে রাখার একটা দীর্ঘশ্বাস হুশ করে বেরিয়ে গেল। আমি কর্নেল পিতওয়ারকে বললাম – “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ”। রক্ষা পেল আমার অতি প্রিয় স্কুল।

এবার কর্নেল পিতওয়ার অন্য রণকৌশল অবলম্বন করলেন। গুর্খা সেনাদের দুই এলএমজি গ্রুপ কে দু’দিক থেকে স্নাইপার পজিশন আক্রমণ করতে বললেন। গুর্খারা দু’দিক থেকে আক্রমণ করার পর স্নাইপার বুঝতে পারলো, সে ক্রস ফায়ারে পড়ে গেছে এবং তার পজিশন আমরা জেনে গেছি। সে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে গেলো আর আমরা এই সুযোগে ট্যাঙ্ক নিয়ে সাতমাথা চলে এলাম। দু’দিক থেকে গুর্খার দল ছুটে গেলো বগুড়া জিলা স্কুলের ভিতরে। আমিও জিপিওর সামনের গেট দিয়ে ঢুকে গেলাম স্কুলের ভিতর। স্কুলের মাথের ভেতর তখনো ১০-১২ জনের মতো পাক সেনা আকাশের দিকে হাত তুলে স্যারেন্ডার করেছে। তাদের ঘিরে আছে গুর্খা সেনারা। আমি এসে যেখানে দাঁড়ালাম, সেখানে স্কুলে পড়ার সময় আমাদের অ্যাসেম্বলি হতো। মুহূর্তের মধ্যে মনের পাতায় ভেসে এলো যাওয়া স্মৃতির হাতছানি। মনে হোল আমাদের অতি প্রিয় দপ্তরী কালিপদ ঢং ঢং করে স্কুলে ঘণ্টা বাজাচ্ছে। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি সেই ঘণ্টাধ্বনি। আর চোখের সামনে ভেসে এলো কত স্রদ্ধেয় শিক্ষকের মুখ।

আমাদের হেডমাস্টার এস এম আহমেদ, তাজমিলুর রহমান স্যার, রকিব স্যার, জসীম স্যার, আরও আরও কত স্রদ্ধেয় মুখ। যারা ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। গুরু অতি আপনজন, ভুলবো না তাঁদের। আমি যেখানেদাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানে অ্যাসেম্বলির সময় পতাকা উড়ানো হতো। আজ আমি এখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াবো। যেই ভাবা, সেই কাজ। স্কুলের লাইব্রেরীর কাছে খুঁজে পেলাম একটি পরিত্যাক্ত বাঁশ। বাঁশটা ধরে যখন টানাটানি করছি, তখন এগিয়ে এলো কয়জন গুর্খা সেনা। আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তারা নিজেরাই আমাকে সাহায্যের হাত বারিয়ে দিল। যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসাবে গুর্খারা ভোজালি ব্যাবহার করে। গুর্খাদের ভাষায় অতাকে বলে কুরকী। সেই কুরকী দিয়ে ওরা বাঁশটাকে পরিষ্কার করে নিয়ে এলো। বাঁশের মাথায় আমি বেঁধে দিলাম বাংলার পতাকা। আমরা সবাই স্যালুট করলাম সেই পতাকাকে।বগুড়া জিলা স্কুলের ছাত্র হয়ে স্কুলের মাথেই আমি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ালাম। গর্বে এবং আনন্দে আমার চোখে পানি চলে এলো। চেয়ে চেয়ে দখলাম স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে পতপত করে। সেই পতাকা আজো উড়ছে। ভবিষ্যতেও উড়বে।

তথ্যসূত্রঃ রোড-টু-বগুড়া ১৯৭১, লেখক – হামিদুল হোসেন তারেক (বীর বিক্রম)।বগুড়া জিলা স্কুলের ওয়েব সাইট।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button