বগুড়া সদর উপজেলাবগুড়ার ইতিহাস

একনজরে মহাস্থানগড়ের দর্শনীয় স্থান সমূহ


মহাস্থানগড় প্রাচীন বাংলার অন্যতম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। একসময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। প্রাচীন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং তার ধ্বংসাবশেষ ও প্রত্নস্থল হিসাবে সমগ্র বিশ্বের পর্যটক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে মহাস্থানগড় আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
অসংখ্য প্রাচীনরাজা ও ধর্মপ্রচারকের বসবাসের কারনে এই উচ্চ ভূমিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। লুকিয়ে থাকা নগর মহাস্থানগড়েই এক সময় গড়ে উঠেছিল পুণ্ড্রবর্ধন নগর নামের এক প্রাচীন বসতি। যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এখানে অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন। এর ভেতরে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সামন্ত বংশের রাজারা। এরপর এখানে ধর্মীয় সংস্কার করতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারকরা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৬৯৩ সালে বিখ্যাত চীনা ভ্রমণকারী ওয়ানচুন বৌদ্ধ স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য পুণ্ড্রনগর তথা মহাস্থানগড় আসে। তার বর্ণনা মতে, তৎকালীন সময়ে ছয় মাইল আয়তনের পুণ্ড্রনগরী একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা অনেকটা ব্যবলিওন, এথেন্স, মিশরের কাঠামোর মত। মুসলিম শাসনামলে ধীরে ধীরে পুণ্ড্রনগরী মহাস্থানগড়ে পরিণত হয়। ১৮০৮ সালে ‘বুচানন হামিল্টন’ সর্বপ্রথম মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে মহাস্থানগড়কে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
মহাস্থানগড় বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে এর অবস্থান।
দর্শনীয় স্থানসমূহ: সমস্ত মহাস্থানগড়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ।
#মাজার শরীফঅনেক ঐতিহাসিক এবং স্থানীয় লোকের মতে এটি হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র:) এর মাজার ছিল। মহাস্থান বাস স্ট্যান্ড থেকে কিছুটা পশ্চিমে এ মাজার শরীফ অবস্থিত।শাহ সুলতান বলখী (র:) ১৪শ শতাব্দীর একজন ইসলাম ধর্ম প্রচারক ছিলেন। কথিত আছে মাছ আকৃতির নৌকাতে করে তিনি তার শীষ্যদের নিয়ে বরেন্দ্র ভূমিতে আসেন। তাই তাকে মাহী সওয়ার বলা হয়।#কালীদহ সাগরগড়ের পশ্চিম অংশে রয়েছে ঐতিহাসিক কালীদহ সাগর এবং পদ্মাদেবীর বাসভবন। কালীদহ সাগর সংলগ্ন ঐতিহাসিক গড় জড়িপা নামক একটি মাটির দুর্গ রয়েছে। প্রাচীন এই কালীদহ সাগরে প্রতিবছরের মার্চ মাসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বারুন্নী স্নান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে পুন্যার্থীগণ সাগরপাড়ে গঙ্গা পূজা ও সংকীর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
#খোদার পাথর ভিটাখোদার পাথর ভিটা মাজারের পূর্ব পাশে অবস্থিত। আয়তাকার এই বৌদ্ধ মন্দিরটি ছিল পূর্বাভিমুখী। এটি দীর্ঘাকার এবং চৌকাণাকৃতির মসৃণ পাথর যা সাধারণত প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, রাজা পরশুরাম এটি সংগ্রহ করে মসৃণ করে বলী দেয়ার কাজে ব্যবহার করতেন। এখনো কেউ কেউ নগ্ন পায়ে এই চৌকাঠটিতে দুধ ঢেলে ভক্তি নিবেদন করেন।
#বৈরাগীর ভিটাচার যুগ ধরে এটি নির্মিত হয়েছিল। খননের পর কিছু মন্দিরের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। এখানে দুটি মূর্তি খচিত কষ্টিপাথরের পিলার সংরক্ষণ করা হয়।
#শীলাদেবীর ঘাটগড়ের পূর্বপাশে রয়েছে করতোয়া নদী এর তীরে ‘শীলাদেবীর ঘাট’। শীলাদেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। এখানে প্রতিবছর হিন্দুদের গঙ্গাস্নান হয় এবং একদিনের একটি মেলা বসে।
#জিউৎকুন্ড কুপমহাস্থানগড়ের শীলাদেবীর ঘাটের পশ্চিমে জিউৎকুন্ড নামে একটি বড় কুপ আছে। কথিত আছে এই কুপের পানি পান করে পরশুরামের আহত সৈন্যরা সুস্থ হয়ে যেত। যদিও এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
#মানকালির দ্বীপএখানে প্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্বের মধ্যে রয়েছে পোড়ামাটির অলংকার ও থালাবাসন, তার দিয়ে তৈরি গণেশের মূর্তি এবং পনেরো গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের অবশিষ্টাংশ।
#স্কন্ধের ধাপএটি একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মহাস্থানগড় থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে পাকা সড়কের প্রায় ৫০ মিটার পূর্বে একটি জলাশয়ের পাশে এই ধাপ অবস্থিত। ধারণা করা হয় স্কন্ধের ধাপের এই মন্দিরটি হল কার্তিকের মন্দির।
#ভিমের জংগলমহাস্থানগড়ের তিন দিক পরিবেষ্টিত এবং অসংখ্য কালোত্তীর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা সমৃদ্ধ এই ভিমের জংগল।
#গোবিন্দ ভিটামহাস্থানগড় জাদুঘরের ঠিক সামনেই গোবিন্দ ভিটা অবস্থিত। গোবিন্দ ভিটা একটি খননকৃত প্রত্নস্থল। গোবিন্দ ভিটা শব্দের অর্থ গোবিন্দ (হিন্দু দেবতা) তথা বিষ্ণুর আবাস। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের কোনো নিদর্শন এ স্থানে পাওয়া যায়নি। তবুও প্রত্নস্থলটি স্থানীয়ভাবে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত।
#জাদুঘরমহাস্থানগড় খননের ফলে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগের বিভিন্ন দ্রব্যাদিসহ অনেক দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে যা গড়ের উত্তরে অবস্থিত জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত আছে।
#বেহুলার বাসর ঘরমহাস্থানগড় বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমে একটি বৌদ্ধ স্তম্ভ রয়েছে যা সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। স্তম্ভটির উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। স্তম্ভের পূর্ব রয়েছে ২৪ কোন বিশিষ্ট চৌবাচ্চা সাদৃশ্য একটি গোসল খানা। এটি বেহুলার বাসর ঘর নামেই বেশি পরিচিত।
#পরশুরামের প্রাসাদপরশুরামের প্রাসাদ ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের সীমানা প্রাচীর বেষ্টনীর ভিতরে যেসব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়ভাবে এটি তথাকথিত হিন্দু নৃপতি পরশুরামের প্যালেস নামে পরিচিত।

যেভাবে যাবেন:ঢাকা থেকে খুব সহজেই সড়ক পথে বগুড়া যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে যেসব বাস বগুড়া যায় তাদের মধ্যে রয়েছে টি আর ট্র্যাভেলস, শ্যামলী পরিবহন, এস আর ট্র্যাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ। শহরের হাড্ডিপট্টি বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসে এবং দত্তবাড়ি থেকে টেম্পু অথবা সিএনজি বেবিতে চড়ে আধাঘণ্টার মধ্যেই যাওয়া যাবে মহাস্থানগড়ে। ঢাকা থেকে লালমনি এবং রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন বগুড়া হয়ে যাতায়াত করে তাই এই ট্রেনগুলোতে চড়েও যাওয়া যাবে বগুড়া।

বিজ্ঞাপন

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button