বগুড়ার ইতিহাস

বগুড়ার কৃতি সন্তান অবিভক্ত পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী


মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৯ অক্টোবর ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বগুড়া জেলার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পিতাঃ বগুড়ার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক নবাবজাদা মরহুম সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী এবং মাতা মরহুমা জহুরা খাতুন চৌধুরী। পিতামহ মরহুম নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে মুসলিম জাগরণের নেতা ও মন্ত্রী এবং ধনবাড়ির বিখ্যাত নবাব ছিলেন। মাতা-পিতার ৪ ভাই (মোহাম্মদ আলী , আহম্মদ আলী, হামেদ আলী, মাহমুদ আলী) -এর মধ্যে তিনিই জৌষ্ঠ্য।
শিক্ষাজীবনঃমরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বাল্যকাল হইতে তিনি তাহার পিতামহ মরহুম নওয়াব আলী চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তিনি বগুড়া করনেশন ইনষ্টিটিউটে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। তারপর তাহাকে উন্নত শিক্ষার জন্য কলকাতায় গমন করেন। তিনি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মাদ্রাসা হতে বৃত্তি লাভ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। অতঃপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ হতে আই.এ এবং ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে ইংরেজি বিষয়ে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করিবার পর তিনি তাহার পিতা নবাবজাদা মরহুম সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী -এর নির্দেশক্রমে বগুড়ায় ফিরে আসেন এবং পৈতৃক জমিদারীর দায়িত্বভার গ্রহন করেন।


কর্মজীবন এবং রাজনীতিঃমরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী তাহার পিতা (আলতাফ আলী চৌধুরী ও আব্দুল বারী এর অনুপ্রেরণায় বগুড়ার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা গভর্নমেন্টের মনোনীত আনারারী ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া জেলাবোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বগুড়া জেলা স্কুলের ম্যানেজিং কমেটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।


১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘‘ খান বাহাদুর’’ উপাধীতে ভূষিত হন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়ার নবাব বাড়িতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদি-এর সভাপতিত্বে একটি আলোচনা সভায় বগুড়া জেলার মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং বগুড়া জেলার সভাপতি মনোনীত হন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ সময় পর্যন্ত তিনি উক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৪-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভার পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের মনোনায়ন লাভ করে পুনরায় বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদি-এর মন্ত্রীসভার অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই সময়ে খণ্ডকালীন সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং নদীয়ায় যক্ষ্ম হাসপাতাল স্থাপন করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান গঠনের পরে, মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে রেঙ্গুনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কানাডায় পাকিস্থানের হাইকমিশনার পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন।


মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৭ এপ্রিল ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে তাহাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণের আমন্ত্রন জানান এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। প্রধানমন্ত্রী হবার ঠিক আগে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সংবিধান প্রণয়ন কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ছয় মাসের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত একটি সূত্র আইনসভায় পেশ করেন। তার এই সুত্রটি পাকিস্তানের ইতিহাসে “বগুড়া ফর্মুলা” নামে পরিচিত। ৭ অক্টোবর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে “বগুড়া ফর্মুলা” টি আইনসভায় পেশ করা হয়। তের দিন ধরে উপর আলোচনা চলে।
মরহুম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৪ নভেম্বর ১৯৫৩ নভেম্বর সংবিধানের খসড়া তৈরির ব্যাপারে একটি কমিটি গঠিত হয়। খসড়া চূড়ান্ত করার পূর্বেই গুলাম মুহাম্মদ আইনসভা ভেঙ্গে দেন ; যদিও এসময় মোহাম্মদ আলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন আরেকটি মন্ত্রীসভা নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন।


২৬ অক্টোবর ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার এই নতুন সরকার নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয। ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে গোলাম মোহাম্মদ পদত্যাগ করেন । ইস্কান্দার মীর্জা নতুন গভর্নর জেনারেল হন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাহার দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্থান সেন্টো ও সিয়েটোর সদস্যপদ লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের আগস্ট ৮ তারিখে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল ইস্কান্দর মির্জা মোহাম্মদ আলিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।১৯৫৫-১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এবং ১৯৫৯-১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ইস্তফা দিয়ে বগুড়ায় ফিরে এসে জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং পাকিস্থানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তিত মৌলিক গনত্রন্ত্র প্রথার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হন এবং ( এম. এল.এ) নির্বাচিত হন।


১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জুন তিনি পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তিত আইন সভায় যোগদান করেন এবং পাকিস্থান কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাহাছারা বিভিন্ন সংগঠনে সংযুক্ততাঃ

১.অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের কাউন্সিলর (১৯৩১)২. ডেপুটি চেয়ারম্যান, পদ্মপাড়া সেন্ট্রাল কো- অপারেটিভ ব্যাংক (১৯৩৩)৩. সদস্য, বেঙ্গল সিল্ক কমেটি (১৯৩৩)৪. সদস্য, বেঙ্গল ওয়াকফ বোর্ড (১৯৩৭)৫. সদস্য, ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ে এ্যাডভাইজারি কমেটি (১৯৩৭)৬. সদস্য, বেঙ্গল এগ্রিকালচার বোর্ড (১৯৩৮)৭. সদস্য, ঢাকা ইউনিভার্সিটি কোর্ট (১৯৩৮)৮. ফেলো , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ( ১৯৩৯)৯.বাংলা আইন পরিষদের হুইপ ( ১৯৪৩)১০.অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের ( ১৯৪৬)১১. আইন পরিষদের সেক্রেটারি (১৯৪৬)
তিনি বগুড়ার মোহাম্মদ আলী উপমহাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন। দেশ বিদেশে মোহাম্মদ আলী স্মরণে যেসব স্থাপনা নামকরন ও নির্মাণ হয়েছে তা উপস্থাপিত হলঃ১. মোহাম্মদ আলী বগুড়া রোড, করাচী, পাকিস্থান ।২. মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, বগুড়া ।৩. মোহাম্মদ আলী গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, ইসলামাবাদ, পাকিস্থান।৪. মোহাম্মদ আলী রোড (বগুড়া- সান্তাহার) রোড পূর্বে মোহাম্মদ আলী রোড নামে পরিচিত ছিল ।৫. মোহাম্মদ আলী স্পোর্টিং ক্লাব, বগুড়া ।৬. মোহাম্মদ আলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, শিবগঞ্জ, বগুড়া।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোহাম্মদ আলীঃ১. পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের প্রধানমন্ত্রীগণের সন্মেলনে যোগদান।২. উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণকোরিয়া একএীকরণে আন্তজাতিক কমেটির দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।৩. ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ইন্দোনেশিয়া বান্দুং-এ জোট নিরপেক্ষ দেশসমুহের সন্মেলনে যোগদান।৪. যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সহিত সম্পর্ক স্থাপন করেন। উপমহাদেশের তিনিই একমাত্র প্রথম ব্যক্তি যিনি পাকিস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে ফলপ্রসূ ভুমিকা রাখেন।৫. সৌদি আরবের বাদশাহ এর রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রনে সপরিবারে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন।৬. ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহর লাল নেহেরুর সাথে দিল্লিতে বৈঠক করেন।৭. আন্তর্জাতিক জোট সিয়েটা ও সেন্ট -এর সদস্যপদ অর্জন করেন।৮. গণ চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই -এর সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন।৯. প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স , ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর , সৌদিআরব , গ্রীস, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, কোরিয়া, জাপান, বার্মা, ভারত প্রভৃতি সফর করেন।


ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে মরহুমা হামিদা মোহাম্মদ আলী এবং ১৯৫৫ সালে আলিয়া মোহাম্মদ আলী এর সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । তাহার দুই পুত্র হাম্মাদ আলী এবং হামদে আলী।
১৯৬২ সালে তিনি আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হন।১৯৬৩ সালে মোহাম্মদ আলী মৃত্যু বরণ করেন । তাহাকে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) এর বগুড়া জেলায় নবাব বাড়িতে সমাহিত করা হয়।


Writer: Golam Zakaria Kanak .


তথ্যসুত্রঃবগুড়ার ইতিকাহিনী- কাজী মোহাম্মদ মিছের ।বগুড়ার সেতিহাস- কাজী আকতার উদ্দিন মানিক।মোহাম্মদ আলী উইকেপিডিয়া ।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button