বগুড়ার ইতিহাস

জেনে নিন বগুড়া নাম করণের ইতিহাস

ব্রিটিশ আমলে মহকুমা এবং ১৮২১ সালে এই মহকুমাকে 'বগুড়া জেলা' হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়

ত্তরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত পুণ্ড্রনগর খ্যাত বগুড়ার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে নানান কাহিনী প্রচলিত রয়েছে । বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের স্থানিক নাম ছিল ‘বগ্ড়ী’। সেটা রাজা বল্লাল সেনের আমল। সেই আমলে বঙ্গদেশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গ, বরেন্দ্র, মিথিলা, বাঢ় ও বগ্ড়ী।

বিজ্ঞাপন

শেষোক্ত ‘বগ্ড়ী’ অংশে নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী ‘বাগিদ’দের সংখ্যাগুরুত্ব ও অধিক শক্তিমত্তা ছিল। এই বাগদি শব্দটিই অপভ্রংশ ‘বগ্ড়ী’ রূপ ধারণ করতে পারে। কালে রূপান্তরিত এই ‘বগ্ড়ী’ই ‘বগুড়া’ উচ্চারণে স্থির হয়েছে বলে একটি ধারণা রয়েছে। তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ বগুড়ার অবস্থান বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে নয়।

বিজ্ঞাপন

বগুড়ার প্রাচীন নাম বরেন্দ্রভূমি ও পৌণ্ড্রবর্ধন। আজকের রাজশাহীও এই অঞ্চলভুক্ত ছিল। অঞ্চলটি ৯ থেকে ১২ শতক সেন রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। পরে ১৩শ শতকের শুরুতে তা মুসলিম শাসকদের অধীনে আসে। ১৩শ শতকের শুরুতে এই এলাকা মুসলিম শাসকদের হাতে যায়। তারপরও সেন বংশের নৃপতিরা সামন্তপ্রধান হিসাবে প্রায় ১০০ বছর শাসনকার্য চালায়। এরপর অচ্যুত সেনের আচরণে রাগান্বিত হয়ে গৌড়ের বাহাদুর শাহ (?-১৫৩৭) সেনদের বিতাড়িত করেন।

১৭৬৫ সালে মোঘল সম্রাটের নিকট হতে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার (এই অঞ্চল) দিওয়ানি গ্রহণ করে। হযরত সুলতান বলখী মহিউদ্দিন মাহীসওয়ার এই এলাকায় ধর্ম প্রচার করেন।

করতোয়া নদীর তীরে ইংরেজরা ১৮২১ সালে বগুড়া জেলার পত্তন ঘটিয়েছিল, এই জনশু্রতি এবং অনুমান দ্বিধামুক্ত না হলেও উপাত্তটি একেবারে আমলের বাইরে রাখা যায় না। মূলত এই অনুমানের ২৮ বছর পরে, ১৮৫৯ সালে বগুড়া জেলা গঠিত হয়। যদিও ১৮২১ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা বগুড়া শহরের গোড়পত্তন ঘটেছিল।

দিল্লীর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন (১২৬৫-৮৭) এর সেনানায়ক। এই সেনানায়কই বাংলাকে দেখাশোনার জন্য সুলতান গিয়াস উদ্দিন কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে এসেই তুঘরিল খাঁ বিদ্রোহ করেন এবং নিজেকে বাংলার শাসক ঘোষণা করেন। গিয়াস উদ্দিন তখন তার কনিষ্ঠ পুত্র বগ্রা খাঁ-কে দিয়ে ঐ বিদ্রোহ দমনার্থে অভিযান পরিচালনা করেন। বগ্রা খাঁ সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করে তুঘরিলকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এই অভিযানে বিজয় অর্জনের পর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন লক্ষণাবতী, বাংলা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার শাসনাধিপতি সরূপে বিজেতা শাহজাদা বগ্রা খাঁকে নিযুক্ত করেন। এই বগ্রা খাঁ-র মূল নাম ছিল নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ (?-১৪১১)। ইনি ছিলেন বড় প্রমোদন্মত্ত, জলসাপ্রিয় এবং পানাসক্ত। পিতা গিয়াস উদ্দিন বলবন শাহ শাসনকার্যে নিযুক্তি দিয়ে পুত্রকে সত্যনামা ও শপথ পাঠ করান যে, বাংলার সমগ্র অঞ্চলে বলয় বিস্তারের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নাচ-গানের জলসায় যাবেন না। এই সময় আলোচ্য বগ্রা খাঁ-র নামানুসাওে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের পাশে একটি শহর গড়ে তোলা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর ৪ এর দশকে করতোয়া নদীর তীরে গড়ে তোলা এই শহরেরই নাম বগুড়া।

মোঘল আমলে পূর্বে কিছুকাল এবং সুলতানি আমলের পর, এই করতোয়াবর্তী শহরের বিস্তার-প্রসার স্তিমিত হয়ে পড়ে। উক্ত জমিদারদের সময়ে নতুন করে পুনরায় নগররূপে তা উদ্ভাসিত হতে থাকে। ব্রিটিশ আমলে মহকুমা এবং ১৮২১ সালে এই মহকুমাকে ‘বগুড়া জেলা’ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, পূর্ব পাকিস্তানের শেষ দিকেও বগুড়ার বানান ‘বগ্রা’ লেখা হতো। বলা যায় পাকিস্তানের শেষে এসে ‘বগ্রা’ ‘বগুড়া’ হয়ে যায়। লক্ষণীয়, ‘বগুড়া’র ইংরেজি বানান এখনও অবিকল ‘বগ্রা’ই (Bogura) রয়ে গেছে।

বগ্রা খাঁ কেবল প্রমোদবিলাসী এবং ভোজনবিলাসীই ছিলেন না, তার চারিত্র্য বিস্ময় আরও আছে। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিল্লীতে। ফলে দিল্লীর প্রতি বেশি মায়া থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু যৌবনে বাংলায় এসে তিনি অধিক মায়ায় পড়ে যান এই অঞ্চলের। পিতা দিল্লীর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন আপন জীবনাসান আসন্ন অনুধাবন করে পুত্র বগ্রা খাঁকে দিল্লীর সিংহাসনে বসতে অনুরোধ এবং আহ্বান করেন। বগ্রা খাঁ তখন দিল্লী গিয়ে পিতার অনুরোধ বিনীতভাবে প্রত্যাখান করে বাংলায় ফিরে আসেন। গিয়াস উদ্দিন বলবনের মৃত্যুর পর বগ্রা খাঁ তার ১৭ বছর বয়সের পুত্র কায়কোবাদকে (১২৭০-১২৯০) দিল্লীর সিংহাসনে বসিয়ে দেন। অর্থাৎ পুত্র দিল্লী বা কেন্দ্রের শাসনকর্তা, আর পিতা তারই অধীনে বাংলার শাসনকর্তা। কিন্তু পুত্র কায়কোবাদ পিতার ন্যায় আমোদাসক্ত জলসাপ্রিয় হয়ে নিজেকে আনন্দব্যসনে ভাসিয়ে দেন। পিতা উপদেশ পাঠালেন তাকে। কোন কাজ হলো না। উজিরদের কুমন্ত্রণায় শেষে দিল্লী ও বাংলার মধ্যে  পিতা-পুত্রের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন হয়। এদিকে পুত্র হলেন কেন্দ্র দিল্লীর শাসক, ওদিকে অধীনস্ত বাংলার শাসক হলেন পিতা। প্রাসাদষড়যন্ত্র বাধিয়ে দিতে উজিররা কোনরূপ কুণ্ঠাবোধ করলেন না। পিতা বগ্রা খাঁ হাতিবাহিনী নিয়ে দিল্লীর দিকে অগ্রসর হলেন। তারা পৌঁছলেন অযোদ্ধার সুরোয নদীর তীরে। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পুত্র কায়কোবাদও এগিয়ে এলেন। মাঝে সুরোয নদী। যুদ্ধ আসন্ন, চলতে থাকলো দুই অধিপতি পিতা ও পুত্রের দূতমারফত চিঠি চালাচালি। কুচক্রী উজিররা উস্কে দিলেন পুত্রকে। হোক পিতা, তবুও অধীনস্ত বাংলার অধিপতি হিসাবে পিতাকে মাটিচুম্বন করে পুত্রের প্রতি মাথা নত করেই তার সাথে সাক্ষাত্ করতে হবে। সব শর্ত মেনেই পিতা রাজি হলেন পুত্রের সাথে দেখা করতে। পিতা মাথা নত করেই গিয়ে দাঁড়ালেন পুত্রের সামনে। পুত্র কায়কোবাদের ক্রোধ নিভে গেল পিতার সন্মান চেতনার কাছে। তিনি সিংহাসন থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে পিতাকে আলিঙ্গন করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। পিতাও কাঁদতে লাগলেন। অবসান হলো পিতা-পুত্রের যুদ্ধসম্ভাবনার। একসঙ্গে তারা বসলেন সিংহাসনে।

দিল্লী ও বাংলার প্রশাসনিক মর্যাদা হলো সমান-সমান। এই সমান মর্যাদা ও তার পূর্ববর্তী সময় মিলিয়ে বগ্রা খাঁ দীর্ঘ ৪০ বছর বাংলা শাসন করেন।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button