ধুনট উপজেলা

প্রতিবন্ধকতা আর দারিদ্রতা দমাতে পারেনি ধুনটের ২৫ নারীর ভাগ্য

প্রতিবন্ধী ২৫ নারী।  বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছর।  কারো এক পা, কারো দুই পা নেই।  কেউ শ্রবন, কেউ বাক প্রতিবন্ধী।  সবার কর্মহীন জীবন।  ওরা অভাবী পরিবারের মাথায় বোঝার মতো। প্রতিবন্ধকতা আর দারিদ্রতার থাবায় মুছে গেছে ওদের জীবনের সব রং।  হতাশার কফিনে ঢাকা পড়েছে ভবিষ্যৎ।  ইচ্ছা শক্তি থাকলেও নেই কাজের সুযোগ।  তাই ঘরে বসেই কঠিন সময় পার করতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

এমন প্রতিকুলতার মাঝে আলোর দিশারি হয়ে ওদের পাশে দাড়ান মোর্শেদা হক মুকুট মনি নামে এক এনজিও কর্মকর্তা।  তিনি গ্রামের এসব প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মজীবি হতে উৎসাহিত করেন।  তাঁর কথায় আগ্রহ দেখায় প্রতিবন্ধী নারীরা।  বিনামূল্যে প্রতিবন্ধীদের পোশাক তৈরীর প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষনকে কাজে লাগিয়ে খুজে পেয়েছে আয়ের পথ। এখন আর কেউ পরিবারের বোঝা নয়।  ইচ্ছা শক্তিতে প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে দিন বদলের স্বপ্ন বুনছেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার গ্রামীন জনপদের ২৫ নারী।

বেসরকারি সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা মোর্শেদা হক মুকুট মনি।  তিনি সংস্থার হয়ে হতদরিদ্র প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করেন।  তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন গ্রামের অভাবী পরিবারের ২৫ জন প্রতিবন্ধী নারীর জন্য পোশাক তৈরীর প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন।

ধুনট পৌরসভা কার্যালয়ে ৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত প্রতিবন্ধী এসব নারী প্রশিক্ষন নেয়। ব্লাউজ, পেটিকোর্ট, পাজামা, কামিজ, সার্ট, বোরকাসহ নারী ও শিশুদের নানা ধরনের পোশাক তৈরীর কাজ শিখেছে। ইউপিপি উজ্জীবিত প্রকল্পের আওতায় পিকেএসএফ ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় প্রশিক্ষন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে টিএমএসএস। 

প্রশিক্ষন শেষে প্রত্যেক নারীকে এক হাজার ২০০ টাকা ও বিনামূল্যে একটি করে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়।  প্রতিদিন বাড়িতে বসে গ্রামের নারী ও শিশুদের পোশক তৈরী করছে।  ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততার মাঝে দিন কাটছে।  শহরের দর্জিদের চেয়ে কম মূল্যে পোশাক তৈরী করায় গ্রাহক সংখ্যাও বাড়ছে।

নলডাঙ্গা গ্রামের রুপালী খাতুন প্রায় ৩ বছর আগে সড়ক দূর্ঘটনায় এক পা হারিয়েছে। তারপর থেকে পরিবারের বোঝা হয়ে ঘরে বসেছিল।  সেলাই প্রশিক্ষন শিখে সে এখন আয়ের পথ খুজে পেয়েছে।  ঘরে বসেই অভাব জয়ের যুদ্ধ করছে। রুপালী খাতুন বলেন, আগে মনে করেছি প্রতিবন্ধী মানেই অভিশপ্ত জীবন।  কিন্ত সেলাই প্রশিক্ষন শিখে সেই চিন্তা চেতনা বদলে গেছে।  পোশাক তৈরী করে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টাকা করে আয় করছি।  এখন আগের চেয়ে ভাল আছি।  এই কর্মের মাঝে জীবনের সাফলতা অর্জন করতে চাই।

রাঙ্গাামটি গ্রামের তমালিকার জন্ম থেকেই পা দুটি উল্টো।  বাঁকা ও সরু।  পা দুটি অকেজো।  দুই হাত দিয়ে তাই চলতে হয়।  পায়ে জোর নেই তো কী হয়েছে, তার মনের জোর আছে শতভাগ।  তাই ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে পোশাক তৈরীর প্রশিক্ষন নিয়েছে।  এখন সে ঘরে বসেই প্রতিদিন আয় করছে প্রায় ২৫০টাকা। তার মলিন মুখে এখন সোনালী দিনের হাসি ফুটে উঠেছে। তমালিকা খাতুন বলেন, আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি।  লেখাপড়ার পাশাপাশি পোশাক তৈরী করে বাড়তি আয় করছি।  পরিবারের কাছে এখন আমি আর বোঝা নয়।  সবাই আমাকে অনেক আদর করে।

রুপালী ও তমালিকার মতো রেনুকা, রুবিনা, শাপলা, আশামনি ও আখি খাতুনসহ ২৫ প্রতিবন্ধী নারী পোশাক তৈরীর প্রশিক্ষন নিয়ে ঘরে বসেই বাড়তি আয় করছে।

এ বিষয়ে মোর্শেদা হক মুকুট মনি বলেন, প্রতিবন্ধীরা বোঝা নয়।  তারা জীবন সংগ্রামে সাধারণ মানুষের মতোই ভূমিকা রাখে।  তাদের মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা একজন সাধরণ মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।  তাই অবহেলা না করে এই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে ভালো থাকবেন তারা।  এই চিন্তা চেতনা থেকেই প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষন দিয়ে তাদের ভাগ্যের উন্নয়নে সহযোগীতা করছি।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button