মুক্তিযুদ্ধ বগুড়া

১৫ই এপ্রিল শহীদ বুদ্ধিজীবী এ. কে. এম. শামসুদ্দীন সাহেবের শাহাদাৎ দিবস

আকবর আহমেদ: কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ছিলেন প্রকৌশলী এ কে এম শামসুদ্দীন (আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন)। এই প্রকল্পের সঙ্গে তিনি প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলেন। এখানকার তিনটি বিদ্যুৎ ইউনিট তাঁর হাতেই তৈরি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ছেড়ে
তিনি কোথাও যাননি। একাত্তরের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা কাপ্তাইয়ের অবাঙালিদের (উর্দুভাষী) হত্যা করার মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। ১৫ই এপ্রিল ৩.৩০ মিনিটে কাপ্তাইয়ের প্রধান বাঁধের ওপর দাঁড় করিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

এ ঘটনা ও এ কে এম শামসুদ্দীন সম্পর্কে জানা যায় তাঁর স্ত্রী মাহবুবা বেগম শামসুদ্দীনের ‘আমার স্বামী’ রচনা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার স্বামী ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। যারা দেশকে নিয়ে চিন্তা করত, দেশের লোকদের মঙ্গল কামনায় উদ্বিগ্ন থাকত, তাদের অনেকেরই বুক ১৯৭১-এর যুদ্ধে নিষ্ঠুর বর্বরদের বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে, বধূর সোহাগ মুছে গেছে, অনেকে মাতৃ-পিতৃহারা হয়েছে।

‘১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো। বিহারি-বাঙালি সবাই মিলে গড়ে তুলবে সুন্দর বাংলাদেশ। সুন্দর দেশের মানুষেরা হবে সৎ ও পরিশ্রমী। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আমরা সকলে কাপ্তাইয়ে আলোচনা সভা ও মিছিল করেছিলাম। স্লোগান ছিল, “বাঙালি-বিহারি ভাই ভাই, এ দেশের সম্পদ আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশ বাংলাদেশ।” কিন্তু দূরের এক অশুভ এলোমেলো উড়ো বাতাসের ঝাপটায় সবকিছু যেন তছনছ হয়ে গেল। সকলেই এক প্রচ্ছন্ন আগ্নেয়গিরির উত্তাপে শিহরিত হতে থাকল। তিনি ছিলেন কাপ্তাইয়ের সূর্য। সূর্যের অভাবে বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ অচল। তার ফলে দেশের বিভিন্ন অংশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। একদিকে যোদ্ধাদের সাহায্য করা, অন্যদিকে উর্দুভাষীদের নিরাপদ রাখা। আর তার মধ্যে তিনি ব্যস্ত কাপ্তাইয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্র সচল রাখতে। এই কেন্দ্র ছিল দেশের এক মূল্যবান সম্পদ।

‘চাটগাঁয় এক পাহাড়ের ওপর ছিল স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। তা হঠাৎ বিকল হয়ে গেল। একটা পুরোনো ব্যাগে যন্ত্রপাতি নিয়ে ময়লা খাকি প্যান্ট ও শার্ট পরে চাটগাঁ গেলেন বেতারকেন্দ্র ঠিক করতে। সন্ধ্যায় ফিরলেন। ঘন ঘন লোকজন চাটগাঁ থেকে কাপ্তাইয়ের দিকে আসছে আর পাহাড়ের পথ ধরে ভারতে যাচ্ছে। সকলের মুখে এক অনুরোধ—“শ্যামা (শাসনহীন) ভাই, আপনি চলে যান। এখান থেকে না গেলে নরঘাতকরা আপনাকে ছাড়বে না।” কিন্তু সেসব তাঁর “কর্ণে বা মর্মে”—কোনোখানেই পৌঁছেনি। দর্শনের বই পড়তেন খুব, তাই বোধ হয় মৃত্যুটা তাঁর নির্ভীক চেতনায় ডাক দিত—“মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।”

১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পাক নরপশুরা কাপ্তাইয়ে প্রবেশ করে। বেলা সাড়ে তিনটায় তারা জিপে করে বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। বাসায় ঢুকে প্রথমে পরিচয় দিয়ে করমর্দন করল—পরমুহূর্তে রাইফেল তাক করে সাদর সম্ভাষণ জানাল—“হ্যান্ডস আপ।” আমরা কয়েকজন মহিলা তখন ভেতরের ঘরে। একজন এসে বলল, “কি করেন আপনারা, সাহেবদের (এ কে শামসুদ্দীন ও প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ার এ কে সালেহ) যে সৈন্যরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে মারবার জন্য।’ আমরা দৌড়ে বসবার ঘরের দিকে আসছি, দেখি কয়েকজন সৈনিক ঘরের মধ্যে এদিক-ওদিক লাফ দিয়ে অস্ত্র তাক করছে। দুজন নল দিয়ে তাঁদের পিঠে ধাক্কা দিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে জিপের ভেতর ঢোকাল।

শুনলাম একজন মহিলা (নিহত পাঠান ড্রাইভারের স্ত্রী) এদেরকে নিয়ে এসেছে এই অভিযোগে যে, প্রকল্পের ম্যানেজার ও প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ারই নাকি কাপ্তাইয়ের বিহারি ও উর্দুভাষীদের মারবার পরিকল্পনা করেছে। এদিকে তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে দেখে ওখানকার দুজন উর্দুভাষী অফিসার ও দুজন আমেরিকান সেনাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং আরেকটি গাড়ি নিয়ে তাদের অনুসরণ করলেন। কিন্তু যারা মারার নেশায় ক্ষিপ্ত, তাদের কি কোনো কিছুতে মন গলে? রাইফেল তাক করে ওই গাড়িকে তারা বারবার ভয় দেখায়, যাতে তারা আর অগ্রসর না হয়। ওই জিপে বসা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে শুনেছি, মৃত্যুকে শামসুদ্দীন বীরের মতো বরণ করেছিলেন। প্রাণ ভিক্ষা করে নিজেকে ছোট করেননি।’ (স্মৃতি ১৯৭১, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, প্রকাশ ১৯৮৯)।

এ কে এম শামসুদ্দীনের জন্ম ১৯২৮ সালের ৯ জানুয়ারি, বগুড়া জেলার গোকুল গ্রামে। বাবা আবুল খায়ের মোহাম্মদ সুলায়মান, মা সারেজাহান নেছার। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি এবং ঢাকার আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ১৯৫১ সালে বিএসসি (ইলেকট্রিক্যাল) পাস করেন। ১৯৫২ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে যোগ দেন। কর্মজীবনে ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক।

কৃতজ্ঞতাঃ গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান ও তাপশ আলম।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button