আমার হাতটা এমন ভাঁজ করে রাখছো কেন? অনেক ব্যথা, হাতটা একটু টেনে দাও, একটু সোজা করে দাও

বিশেষ প্রতিবেদন (ঢাকা) :  ‘একটা হাত যে নেই, এখনও সেটা বোঝেনি মা-বাপ মরা ছেলেটা। কিছুক্ষণ পরপর বলে, আমি কোথায়, কতো মানুষ রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়, কারও হাত ভেঙে যায়, ব্যথা পায়, কিন্তু আমার ছেলেটার একটা হাতই ছিঁড়েই গেলো? ভেঙে গেলেও তো হাতটা সঙ্গে থাকত, আল্লাহ তুমি এমন কেন করলা, কি শাস্তি দিলা?’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন দুই বাসের চাপায় হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের বড় খালা জাহানারা বেগম।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

খালা জাহানারা বেগম বলেন, “রাজীবের হাতের অপারেশনের পর যখন ওর জ্ঞান ফিরলো, তখন থেকে ছেলেটা বলছে, ‘আমার হাতটা এমন ভাঁজ করে রাখছো কেন? অনেক ব্যথা, হাতটা একটু টেনে দাও, একটু সোজা করে দাও। আমি বসতে চাই, একটু বসাও। হাতে অনেক ব্যথা করছে।’ আমি ওকে কি উত্তর দেবো বুঝি না।”

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় রাজীব হোসেন নামের তিতুমীর কলেজ ছাত্রের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে হাতের অপারেশন করার পর বুধবার বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজীবকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

বাংলামোটর থেকে ফার্মগেটমুখী বিআরটিসির একটি দোতলা বাসে ছিলেন রাজীব। সেটি সার্ক ফোয়ারার কাছে পান্থকুঞ্জের পাশে সিগন্যালে এসে থামে। এ সময় একই দিক থেকে আসা স্বজন পরিবহনের একটি বাস দ্রুতগতিতে দোতলা বাসের পাশের ফাঁক দিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় চাপা খেয়ে রাজীবের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে দোতলা বাসের সঙ্গে ঝুলতে থাকে। এ ঘটনায় ওই বেপরোয়া দুই বাস জব্দসহ দুই বাসচালক ওয়াহিদ ও খোরশেদকে গ্রেফতার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ট্রলিতে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন রাজীব হোসেন। আর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে রাজীবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তার বড় খালা। এদিকে তার মামা ও ছোট খালা তার ভর্তির ব্যাপারে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছেন। রাজীবের মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। মা-বাবা হারা ছেলের এই অবস্থা দেখে বারবার চোখের পানি মুছছেন সঙ্গে থাকা দুই খালা জাহানারা বেগম ও খাদিজা বেগম।

আহত রাজীবের পাশে খালা জাহানারাবড় খালা জাহানারা বেগম ডাক অধিদফতরে শাখা সহকারী পদে চাকরি করেন। দুর্ঘটনার পর পথচারীরা রাজীবের মোবাইল ফোন থেকে জাহানারা বেগমকে দুর্ঘটনার কথা জানান। পরে রাজীরের স্বজনেরা ছুটে আসেন শমরিতা হাসপাতালে।

রাজীবের খালা জাহানারা বেগম বলেন, ‘গত ১০ বছর আগে আমার বড় বোন (রাজীবের মা) মারা যায়। ৬ বছর আগে ওর বাবাও মারা যান। সেই ছোট থেকে রাজীব আমার কাছে থেকে বড় হয়। আমারও দুই সন্তান আছে, তবে রাজীব আমার কাছে বেশি আদরের। রাজীব এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে যখন ডিগ্রিতে ভর্তি হয় তখন আমার ফকিরাপুল টিএনটি কলোনির বাসা থেকে চলে যায়। দুই বছর হলো রাজীব যাত্রাবাড়ীর মিরাজিবাগে একটি মেসবাসায় ভাড়া থাকে। আহত রাজীব হোসেন তিতুমীর কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে সে বরিশালের একটি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স করছে। তার ছোট ভাই মেহেদী হাসান (১৩) ও আব্দুল্লাহ (১১) দুজনই রাজধানীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পড়ে।’

স্বজনরা জানান, ঘটনার পর পুলিশ ও পথচারীরা রাজীবকে নিয়ে যায় পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিকভাবে ডাক্তার অপারেশন করে রাজীবের হাত কেটে ফেলে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে ওর বন্ধুরা এসে রক্ত দিয়ে যায়। মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত একদিনে হাসপাতালের বিল হয় ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এরমধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা হাসপাতালেরই চার্জ। ওষুধের জন্য ১৭ হাজার ৭০০ টাকা নগদ দেয় রাজীবের পরিবার। পরে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে বিল বাকি রেখে রাজীবের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢামেকে আনা হয়।

রাজীবের মামা জাহিদুল হাসান বলেন, ‘শমরিতা হাসপাতালে একদিনে অনেক খরচ হয়ে গেছে। এত টাকা দেওয়ার মতো আমাদের সামর্থ্য নেই। রাজীব বাবা-মা মরা ছেলে। ডিগ্রি পড়ার পাশাপাশি একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করে রাজীব নিজের খরচ চালাতো, ভাইদেরও সহায়তা করতো।’

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button