মুক্তিযুদ্ধ বগুড়া

ভাষা আন্দোলনের সময় বগুড়া হয়ে ওঠে মিছিলের শহর

মাতৃভাষাকে ঘিরে যে গণআন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালে তা শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিলো। মহান ভাষা আন্দোলনে বগুড়ার ইতিহাস সংরক্ষণ করতে গিয়ে ভাষা সৈনিকদের লেখা নিয়ে কবি আজিজার রহমান তাজ সম্পাদিত “ভাষা আন্দোলনে বগুড়া” শীর্ষক প্রকাশনায় উঠে এসেছে অজানা অনেক ইতিহাস ।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৮-এর ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট পালনের কর্মসূচিতে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ (বর্তমানে পুরাতন ভবন) থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ে। মিছিলটি সুবিল ব্রীজের কাছে আসলে সেখান থেকে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করেন। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন আজিজুল হক কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। মিছিল শেষে বগুড়া জিলা স্কুলের আমবাগানে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন এবং অসাধারণ এক বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বহুভাষাবিদ এই জ্ঞানতাপসের অংশগ্রহণে বগুড়ায় চলমান ভাষা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৮ সালেই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ে। আজিজুল হক কলেজ থেকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা ও সাহিত্য কর্মী মুহম্মদ আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে সেখানে হামলা চালায় মুসলিম লীগের নেতা ও সমর্থকরা।

ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে আরো আছেন কবি রোস্তম আলী কর্ণপুরী, মোশাররফ হোসেন মন্ডল, অ্যাড. হারুন-উর-রশিদ, কমরেড মোখলেসুর রহমান, আব্দুর রহিম সওদাগর মতিন, সাদেক আলী আহমদ, ডাঃ ননী গোপাল দেবদাস. এ.কে মুজিবুর রহমান, ডাঃ এনামুল হক, ডাঃ সি.এম ইদরিস, ডাঃ আজিজুল হক, আলী আহমদ ও দূর্গাদাস মুখার্জী।

১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে আযিযুল হক কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা, বিড়ি শ্রমিক এবং সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা মিছিল করে নিয়মিত বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাও। ১৭ এপ্রিল আযিযুল হক কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করতে গেলে মিছিলের নেতা আবদুস শহীদ ও ভিএম স্কুলের ছাত্রীনেত্রী সালেহা বেগমসহ কয়েকজন মিছিলকারী মারাত্মক আহত হন।

শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালের শুরুতে কমরেড মোখলেছুর রহমানের উদ্যোগে শহরের বাদুড়তলায় আলীম উদ্দিন মোক্তারের বাসায় একটি গোপন বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সর্বদলীয় কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে ‘৫২ এর ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৭ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার থানা রোডে (বর্তমান কবি নজরুল ইসলাম সড়ক) ছাত্রনেতা আবদুস শহীদের পিতা আবদুল ওহাব খলিফার ত্রিতল বাসার নিচতলার হলঘরে বিপুলসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে কবিরাজ আব্দুল আজিজের সভাপতিত্বে একটি সর্বদলীয় সভা হয়, একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় “সর্বদলীয় বাংলা রাষ্ট্রভাষা কমিটি মতান্তরে “বগুড়া জেলা সর্বদলীয় বাংলা রাষ্ট্রভাষা কমিটি” গঠন করা হয় ।

প্রতিনিধি সভায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ মজির উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি, কৃষক নেতা আবদুল আজীজ কবিরাজ ভিষকরত্নকে সহ-সভাপতি এবং ছাত্রনেতা গোলাম মহিউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি, বগুড়া শাখা গঠন করা হয়।

এই কমিটি গঠন হবার পর পরই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন বেগবান হয়। ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এই কমিটির আহ্বানে জিলা স্কুল ময়দানে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনা জানা মাত্র বগুড়ায় দিনব্যাপী হরতাল পালিত হয়। পরের দিনও হরতাল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন চলতে থাকে। সেদিন থেকে টানা ১৮ দিন বগুড়ার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত বগুড়া ভাষা আন্দোলনের গতি উজ্জ্বলতর হয়ে উজ্জীবিত থেকেছে।

বগুড়ায় ‘৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি বগুড়া জিলা স্কুল ও মোস্তাফাবিয়া আলীয়া মাদ্রাসা ব্যতীত সকল স্কুল-কলেজ এবং শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সকালে জিলাস্কুল মাঠে আমতলায় হারুন-উর-রশিদের সভাপতিত্বে ছাত্রসভা এবং বিকেলে একইস্থানে কবিরাজ আব্দুল আজিজের সভাপতিত্বে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে গ্রেফতার করা হয় ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়া নেতৃবৃন্দের বেশ কয়েকজনকে। এরা হচ্ছেন হারুন-উর-রশীদ, গোলাম মহিউদ্দিন, সুবোধ লাহিড়ী, আব্দুর রহিম সওদাগর মতিন, ছমির মন্ডল প্রমুখ।

বগুড়াতে প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হয় আজিজুল হক কলেজ (বর্তমানে নতুন ভবন) প্রাঙ্গণে । কলেজ ছাত্র ইউনয়নের উদ্যোগে নির্মিত এই শহীদ মিনারের জন্য কলেজের তহবিল থেকে কোন টাকা খরচ করতে হয়নি। স্থানীয় অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে নির্মিত হতে থাকা শহীদ মিনারটির জন্য।

তথ্য – ইঞ্জি: রাফিনুর

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button