প্রয়োজনীয় তথ্য

আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বগুড়া এবং আমার অভিজ্ঞতা

আজ আপনাদের জানাবো আমার পাসপোর্ট পাওয়ার সহজ গল্প

পাসপোর্ট করা নিয়ে আমার মনের ভিতর অনেক ভয় ছিলো, বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করাটা জরুরী হয়ে পড়লো; ভাবলাম এবার আমি শেষ! পাসপোর্ট মানেই দুনিয়ার ঝামেলা। তার ওপর শুনেছি দালাল, ঘুষ আর পুলিশ ভেরিফিকেশন নামে কি যেন একটা আছে তা না কি খুব ভেজাল করে। আমি নিরুপায়, বিদেশ যেতে হলে পাসপোর্ট ছাড়া চলবে না। ভয়ে ভয়ে তাই পাসপোর্টের দিকে হাত বাড়ালাম, অবাক হলাম; পাসপোর্ট পাওয়া খুব সহজ! আজ আপনাদের জানাবো আমার পাসপোর্ট পাওয়ার সহজ গল্প।

বিজ্ঞাপন

প্রথমেই দোয়া পড়তে পড়তে, আল্লাহর নাম নিতে নিতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট আবেদন ফরম পুরন করলাম। বার বার চেক করলাম, বানান ভুল গেছে না কি… ১৫-২০ বার বানান চেক করার পরও মনের ভিতর ভয়! যদি বানান ভুল থাকে। অনেক খোঁজাখুজি করে বুঝলাম, অন্য সময় খুব বেশী বানান ভুল করলেও এখানে আমার বানান ভুল হয়নি।  জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ এরকম আরো কিছু কাগজপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি প্রয়োজন হয়। সবগুলো কাগজপত্র ফটোকপি করে মেয়র স্যারের থেকে সত্যায়িত করে নিলাম। তারপর ছুটলাম সোনালী ব্যাংক বগুড়া প্রধান কার্যালয়ে, সেখানে গিয়ে ৩৪৫০ টাকা জমা দিলাম। সব কাগজপত্র নিয়ে ‘কি জানি কী হয়’ ভাববে ভাবতে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বগুড়া’য় গেলাম। সেখানে গিয়ে ফরম জমা দিলাম। সেদিনই আমার ছবি তুললেন তারা, নিলেন আঙুলের ছাপ, সব মিলিয়ে ঘন্টা খানেক সময় লাগলো (আমি ভেবেছিলাম পাসপোর্ট অফিসে সাত পাক দিতে হবে)। আমাকে একটা রিসিভ দিলেন, সেখানে তারিখ লেখা; যেদিন আমি পাসপোর্ট হাতে পাবো। মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে বাড়িতে গেলাম। কয়েকদিন পর বগুড়া জেলা পুলিশের একজন অফিসার আমাকে কল দিলেন, আমি একটু ভয় পেলাম। পরে ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলো, আমার ভয় ভেঙে গেলো। ভেবেছিলাম আমাকে ধরে ধোলাই দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে ছাড়বে, পড়ে বুঝলাম এসব কিছুই না। আসলে পুলিশেরাও মানুষ, আর মানুষ তো মানুষের মতোই। সব মানুষই ভালো, আসলে কেউ খারাপ না শুধু দূর থেকে একটু কঠিন মনে হয়, সব মানুষই আশরাফুল মাখলুকাত, ভালো মন্দ মিলিয়েই মানুষ। পুলিশকে নিয়ে মনের ভিতর যতো ভয় ছিলো সেদিন সব ভয় কেটে গেলো। সেদিন মনে হলো পুলিশ জনগণের সত্যিকারের বন্ধু।

কয়েকদিন পর বগুড়া উন্নয়ন মেলায় পরিচয় হলো আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বগুড়ার’র সহকারী পরিচালক সাহজাহান কবির স্যারের সাথে। আমি তাঁকে জিগ্গেস করলাম পাসপোর্ট কবে পাবো। আমার Enrolment ID নিয়ে তিনি জানালেন পাসপোর্ট বর্তমানে প্রিন্টে আছে প্রস্তুত হলে আমাকে ম্যাসেজ দিয়ে জানানো হবে। কয়েকদিন পর ম্যাসেজ পেলাম, সাহজাহান স্যারকে ফোন দিলাম, স্যার জানালেন আমার পাসপোর্ট প্রস্তুত। আমি অফিসে গিয়ে হাসিমুখে পাসপোর্ট নিয়ে এলাম, পাসপোর্ট পেতে আমার খরচ সর্বমোট ৩৪৫০ টাকা।

আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বগুড়া’র সহকারী পরিচালক সাহজাহান কবির স্যারের সাথে কথা বলে আমি মুগ্ধ হলাম। কোনো ঘুষ ছাড়া, দালাল মুক্ত, ঝামেলা মুক্ত, পাসপোর্ট সেবা দিতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। মনে মনে বলে উঠলাম, যতদিন বাংলাদেশে সাহজাহান কবির স্যারের মতো কর্মকর্তা আছেন, ততদিন পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

 

এবার আপনাদের জানাবো পাসপোর্ট সংক্রান্ত কিছু তথ্য:

সূত্র: ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা এমআরপি  হচ্ছে এমন একটি পাসপোর্ট যাতে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত তথ্য জলছাপের মাধ্যমে ছবির নিচে লুক্বায়িত থাকে এবং একই সঙ্গে এতে থাকে একটি “মেশিন রিডেবল জোন(MRZ)” যা পাসপোর্ট বহনকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, বিবরণী ধারণ করে। MRZ লাইনে লুকায়িত তথ্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট  মেশিনের মাধ্যমে পড়া যায় ফলে ভ্রমণ ডকুমেন্ট এর নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং MRZ লাইন দ্রুততম সময়ে পড়া যায় ফলে ইমিগ্রেশনে প্রক্রিয়াকরণ সময় কম লাগে। এমআরপি কম্পিউটার এ মুদ্রিত।

 

কিভাবে করবেন এমআরপি ?

  1. প্রথমে এমআরপি ফরম সংগ্রহ করতে হবে। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে অথবা ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এর ওয়েবসাইট  থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন।
  2. অথবা online এ আবেদন করুন ।
  3. আবেদন ফরম পূরণ করার আগে আবেদনপত্রে উল্লিখিত নির্দেশাবলী ভালভাবে পড়ুন। নির্দেশাবলী   অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র/দলিলপত্রাদি  সংযুক্ত করুন।
  4. ব্যাংকে পাসপোর্টের নির্ধারিত ফি প্রদান করে ব্যাংক ভাউচার আবেদন ফরম এর সঙ্গে সংযুক্ত করুন।
  5. পূরণকৃত ফরম সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে উপস্হিত হয়ে জমা দিন।

প্রয়োজনীয় তথ্য:

  1. সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাষিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্থায়ী কর্মকর্তা/কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরীজীবি, সরকারি চাকুরীজীবিগণের নির্ভরশীল স্বামী/স্ত্রী এবং তাদের ১৫ (পনের) বৎসরের কম বয়সের সন্তান, ৫ (পাঁচ)/১০ (দশ) বৎসরের অতিক্রান্ত, সমর্পণকৃত (সারেন্ডারড)দের জন্য একটি ফরম ও অন্যান্যদের ক্ষেত্রে নতুন পাসপোর্টের জন্য ২ (দুই) কপি পূরণকৃত পাসপোর্ট ফরম দাখিল করতে হবে।
  2. অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৫ বছরের কম) আবেদনকারীর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পিতা ও মাতার একটি করে রঙিন ছবি (৩০ x ২৫ মিঃমিঃ) আঠা দিয়ে লাগানোর পর সত্যায়ন করতে হবে।
  3. জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক টেকনক্যাল সনদসমূহের (যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ড্রাইভার ইত্যাদি) সত্যায়িত ফটোকপি।
  4. যে সকল ব্যক্তিগণ পাসপোর্টের আবেদনপত্র ও ছবি প্রত্যায়ন ও সত্যায়ন করতে পারবেন – সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও কাউন্সিলরগণ, গেজেটেড কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও পৌর কাউন্সিলরগণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, নোটারী পাবলিক ও আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জাতীয় বেতন স্কেলের ৭ম ও তদুর্ধ্ব গ্রেডের গ্রেডের কর্মকর্তাগণ।
  5. সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাষিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্থায়ী কর্মকর্তা/কর্মচারী ও তাদের স্বামী/স্ত্রী এবং সরকারি চাকুরীজীবিগণের ১৫ (পনের) বৎসরের কম বয়সের সন্তান সাধারণ ফি জমা করে জরুরী সুবিধা পাবেন।
  6. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক জিও (GO)/এনওসি(NOC) দাখিল করতে হবে।
  7. অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরীজীবি ও তাদের নির্ভরশীল স্বামী/স্ত্রী সাধারণ ফি প্রদান করে জরুরী সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের সনদ দাখিল করতে হবে।
  8. পাসপোর্ট সমর্পণকৃতদের (সারেন্ডারড) আবেদনপত্রের সাথে অবশ্যই পূর্বের পাসপোর্ট নিয়ে আসতে হবে।
  9. কূটনৈতিক পাসপোর্ট লাভের যোগ্য আবেদনকারীগণকে পূরণকৃত ফরম ও সংযুক্তিসমূহ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে জমা দিতে হবে।
  10. শিক্ষাগত বা চাকুরীসূত্রে প্রাপ্ত পদবীসমূহ (যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ডক্টর, পিএইচডি ইত্যাদি) নামের অংশ হিসেবে পরিগণিত হবে না। ফরমের ক্রমিক নং ৩ পূরনের ক্ষেত্রে, একাধিক অংশ থাকলে প্রতি অংশের মাঝখানে ১টি ঘর শূন্য রেখে পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীর পিতা, মাতা, স্বামী/স্ত্রী মৃত হলেও তার/তাদের নামের পূর্বে ‘মৃত/মরহুম/Late’ লেখা যাবে না।
  11. ছবি তোলার সময় সাদা পোশাক, সাদা ‍টুপি এবং চোখে চশমা পরা যাবে না।
  12. ছবি, স্বাক্ষর ও আঙ্গুলের ছাপ প্রদানের পুর্বে একটি প্রাক ডেলিভারী রশিদ প্রদান করা হয় যাতে পাসপোর্ট এ প্রদর্শিত সকল তথ্য দেওয়া থাকে। উক্ত রশিদে আপনার তথ্য সঠিক আছে কিনা যাচাই করে নিন এবং কোন তথ্য ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে জানিয়ে তাৎক্ষণিক সংশোধন করে নিতে পারবেন। উল্লেখ্য যে, পাসপোর্ট আবেদনকারীর ছবি, স্বাক্ষর ও আঙ্গুলের ছাপ প্রদানের পর মূল ডেলিভারী রশিদ প্রদান করা হয় এবং এরপর সংশোধনের আর কোন সুযোগ থাকে না। অতএব, কাউন্টার ত্যাগের পূর্বে আপনার তথ্য যাচাই করে ডেলিভারী রশিদ বুঝে নিন।
  13. www.passport.gov.bd এই ঠিকানায় প্রবেশ করে Application Status অপশন থেকে ডেলিভারী রশিদে প্রদত্ত আপনার Enrolment ID এবং Date of Birth প্রদান করে আবেদনের বর্তমান অবস্থা জেনে নিতে পারবেন।

বিঃ দ্রঃ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিটি বিভাগীয়/আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে মুক্তিযোদ্ধা, বৃদ্ধ নাগরিক, অসুস্থ ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য আলাদা কাউন্টারে আবেদন করার ব্যবস্থা আছে।

 

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) ফি (বাংলাদেশ)

 

পাসপোর্ট ফিস সংক্রান্ত তথ্যাবলী:

আবেদনের প্রকৃতি বিতরণের ধরণ পাসপোর্ট ফিস (টাকা)
নতুন আবেদনকারী/ হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণকৃতদের (সারেন্ডার) জন্য জরুরি ফিস (৭ দিন) ৬০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৬৯০০.০০ টাকা
সাধারণ ফিস (২১ দিন) ৩০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৩৪৫০.০০ টাকা
অনাপত্তি সনদ (NOC) এর ভিত্তিতে (জরুরি সুবিধাসহ) ৩০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৩৪৫০.০০ টাকা
সরকারি আদেশ (GO) এর ভিত্তিতে চিকিৎসা, হজ্জ্ব পালন, তীর্থস্থান ভ্রমণের ক্ষেত্রে (জরুরি সুবিধাসহ) ৩০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৩৪৫০.০০ টাকা
সরকারি আদেশ (GO) এর ভিত্তিতে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে (জরুরি সুবিধাসহ) বিনামূল্যে
রি-ইস্যু জরুরি ফিস (৭ দিন) (NOC/GO ব্যতীত) ৬০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৬৯০০.০০ টাকা
সাধারণ ফিস (২১ দিন) ৩০০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৩৪৫০.০০ টাকা
মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফিস (মেয়াদ পরবর্তি প্রতি বছরের জন্য) সাধারণ ফিস ৩০০.০০ + ১৫% ভ্যাট = ৩৪৫.০০ টাকা

 

 

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরীজীবি ও তাদের স্বামী/স্ত্রী (নতুন আবেদন ও রি-ইস্যু উভয় ক্ষেত্রে) সাধারণ ফি প্রদান করে জরুরি সুবিধা পাবেন।

এক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের সনদ দাখিল করতে হবে।

সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি আরও ৫টি ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারবেন।

১) ওয়ান ব্যাংক
২) ট্রাস্ট ব্যাংক
৩) ব্যাংক এশিয়া
৪) প্রিমিয়ার ব্যাংক
৫) ঢাকা ব্যাংক।

 

সবাইকে অসংখ্য ধনবাদ। পাসপোর্টের অভিজ্ঞতা হোক আনন্দের।

শুভকামনা রইলো।

এ বিভাগের অন্য খবর

Back to top button
ভাষা নির্বাচন