লাইফস্টাইল

আপনার সন্তানের কি বন্ধু আছে?

পৃথিবীতে বহুরকম সম্পর্ক আছে, অনেক ঘনিষ্ঠ মানুষ আছে আমাদের। কিন্তু যে কথাটা কাউকে বলা যায় না, যে দুঃখটা কেউ বুঝতে চায় না, তা আমরা বন্ধুদের বলতে পারি নির্দ্বিধায়। বন্ধু এটাই, সুখে এবং দুঃসময়ে আমাদের ভরসা যোগায় তারা।

ছেলেমেয়েরা আগে দুপুর শেষ হলেই বেরিয়ে পড়ত বাইরে, মাঠে খেলতে বা গল্প করতে। মায়েরা ছাদে বা ঘরে চা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত। বাবারা সন্ধ্যায় বা রাতে কাজ থেকে ফিরলে চায়ের বা মহল্লার কোথাও একসাথে বসে দেশ, রাজনীতি, খেলা এসব নিয়ে আলোচনা করত।

সেই সময়গুলি এখন বদলেছে। প্রথমত প্রযুক্তিগত কারণে, দ্বিতীয়ত এখন বিশেষ করে মহামারির কারণে। এখন আর বাইরে তেমন একটা আড্ডা দেয় না ছেলেমেয়েরা। স্কুল আর কোচিংয়ে যাদের সঙ্গে সখ্য হয় তারাই একমাত্র বন্ধু। আর আড্ডা বলতে ফোনে বা ম্যাসেঞ্জারে যতটুকু কথা তারা বলতে পারে সেই বন্ধুদের সাথে।

এখানকার এই এত কম মেশার সুযোগ থাকা বন্ধুত্বগুলিকে আগের মানুষেরা, এমনকি এক্সপার্টরাও খুব ভালো বলেন না। কিন্তু আবার একেবারে বন্ধু না থাকার চেয়ে যে এটা ভালো তা তারা বলেন। অন্তত তারা সঙ্গ পাচ্ছে, নিজের বাইরে অন্য মানুষের সম্পর্কে অল্প কিছু হলেও জানতে পারছে।

বন্ধু থাকলে এমন অনেকগুলি জিনিস বাচ্চারা শেখে, যা ভবিষ্যতে তাদের সাহায্য করে ক্যারিয়ারে, ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল জায়গায় সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে।

#১. আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা জন্মাবে

বন্ধু তৈরির মাধ্যমে আপনার সন্তান আত্মবিশ্বাস শিখবে। প্রতিযোগিতার এই সময়ে আত্মবিশ্বাস কত গুরুত্বপূর্ণ আমরা জানি। আমরা যখন নিজের মত কাউকে দেখি বা অন্যের সাথে মিল খুঁজে পাই, নিজের অজান্তেই তাদের প্রতি আমাদের ভালো লাগা তৈরি হয়। যখন প্রতিবার সেই ভালো লাগার প্রকাশ করতে আমরা তাদের সঙ্গে মিশতে যাই, আমাদের আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

#২. দ্বিমত বা দ্বন্দ্ব কীভাবে সামলাতে হয় শিখবে

আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার সঙ্গে আপনার অনেক মিল থাকতে পারে, কিন্তু তারপরও সে আর আপনি একই মানুষ নন। তাই কারো সাথে মিশতে গেলে সেখানে কখনো না কখনো একটু দ্বন্দ্ব হবেই। এই দ্বন্দ্ব সমাধানের মাধ্যমেই আমরা শিখি কীভাবে এধরনের পরিস্থিতে শান্ত ও সংযত থাকতে হয়। একই সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।

#৩. ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলির বাইরে কিছু ভাবার সুযোগ পাবে

এখন সময় প্রযুক্তির, নানা রকম আকর্ষণীয় ডিভাইসের। যা একই সঙ্গে বাচ্চার কল্পনা ও নতুন সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতার ওপর নেগেটিভ প্রভাব ফেলতে পারে। বন্ধু থাকলে সে কথা বলবে। দুঃখ, কষ্ট যেগুলি বাবা-মাকে বলতে পারছে না, তা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে মানসিক যন্ত্রণ থেকে দূরে থাকতে পারবে।

#৪. আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে অন্যদের কথাও ভাববে

সারাক্ষণ নিজেকে আর ডিভাইস নিয়ে থাকার কারণে বাচ্চারা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে পড়তে পারে। বন্ধু থাকলে সেই সম্পর্কের মর্যাদাও তার কাছে থাকবে, সে ছোটখাটো হলেও কিছু ছাড় দেবে। তাতে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে উঠবে না।

#৫. কল্পনাশক্তি তৈরি হবে

আড্ডা দেয়া, কথা লা, কোনো কিছু আলোচনা করা মানুষের মধ্যে নতুন নতুন কল্পনা ও স্মৃতি তৈরি করে। তা মানুষকে উৎফুল্ল রাখে ও বিমর্ষ হয়ে পড়া থেকে বাঁচায়। আপনার সন্তানের যদি বন্ধু না থাকে তাহলে এই বিষয়গুলি তার মধ্যে কখনোই তৈরি হবে না। সে অল্পতেই ডিপ্রেসড হয়ে পড়তে পারে।

#৬. অন্যান্য পরিবার তথা সমাজ সম্পর্কে শিখবে

অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার মাধ্যমে বাচ্চাদের সামাজিকীকরণ হয় অনেক বেশি। বাচ্চারা একে অন্যের পরিবারগুলি সম্পর্কে জানতে পারে। অন্য পরিবার বলতে একই সঙ্গে ওই পরিবারের ধরন, কালচার ও চিন্তাধারা সম্পর্কে জানতে পারে। তাতে সমাজে সেও যে বাস করে এবং অন্যরাও তারই মত, সেই ধারণা তৈরি হয় তার মধ্যে। এবং পরিবারগুলি সম্পর্কে জানা থাকার কারণে পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা মানুষকে বুঝতে পারে। এই দক্ষতা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল সম্পর্ক ও উন্নতিতে সাহায্য করে।

#৭. স্মৃতি তৈরি হবে

এখন যেই সময়গুলি আমরা পার করছি, তাই আমাদের ভবিষ্যতের স্মৃতি। আপনার সন্তানরা যখন বড় হবে, তারা এই সময়টাকে স্মরণ করবে৷ তারা কোথায় খেলত, কারা তার বন্ধু ছিল, কী কী খেলত, কয়বার বকা খেয়েছে, খেলার মধ্যে কার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে এসব। আর এই সুন্দর সুন্দর স্মৃতি দিয়েই তৈরি হবে তাদের সুন্দর শৈশব। যাদের শৈশব সুন্দর, তারা বড় হয়ে চেষ্টা নিজেদের সন্তানও তেমন পরিবেশ পাক। তাতে করে সুন্দর সময়গুলি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে যেতে থাকে, একটা সুখী কমিউনিটি তথা একটি সুখী সমাজ গড়ে ওঠে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button
error: Content is protected !!