তারুণ্যের কন্ঠস্বরসাহিত্য

একা হয়ে যাও, এখন সময় এক থাকার – রিপন আহসান ঋতু

একা হয়ে যাও, এখন সময় এক থাকার – রিপন আহসান ঋতু

‘একা হয়ে যাও সব সঙ্গ থেকে, উন্মাদনা থেকে, আকাশের সর্বশেষ উদাস পাখির মতো, নির্জন নিস্তব্ধ মৌন পাহাড়ের মতো একা হয়ে যাও। এতো দূরে যাও যাতে কারো ডাক না পৌঁছে সেখানে, অথবা তোমার ডাক কেউ শুনতে না পায় কখনো।’ কবি মহাদেব সাহার এই একা হয়ে যাও কবিতার কথাই এখন সবর্ত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। করোনাভাইরাসসৃষ্ট মহামারির প্রভাবে গোটা দেশের মানুষকেই এখন একা হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বলা হচ্ছে, আপনি বাঁচলে দেশ বাঁচবে আর দেশ বাঁচলে আপনি বাঁচবেন। অথচ এন্থনি ফন লিউয়েনহুক যখন আজ থেকে মাত্র সাড়ে তিনশ বছর আগে আতশী কাঁচের নিচে কিলবিল করা প্রাণগুলোকে দেখতে পেলেন, তখনো তিনি জানেন না যে তিনি এক নতুন দুনিয়ার সন্ধান পেয়ে গেছেন। তিনিই প্রথম আণুবীক্ষণিক প্রাণের দুনিয়াকে মানুষের সামনে উন্মোচিত করেন, ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণগুলোর নাম দেন ‘এনিম্যালকুলস’। ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ এই অণুজীবদের আক্রমণের শিকার হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে কোটিতে কোটিতে, অথচ কারা এই প্রাণহাণির কারণ তা মানুষের বুঝে উঠতে লেগেছে লক্ষ লক্ষ বছর। ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারেরও বেশ কিছু সময় পর, রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস সম্পর্কে মাত্র মানুষ জানতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দির একেবারে শেষভাগে। কয়েকশ বছর আগেও এই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারিগুলোর কারণ হিসেবে অণুজীবকে কল্পনা করা দুরূহ ছিলো। বিভিন্ন দেব-দেবীর কর্মকান্ড বা মানুষের পাপের শাস্তি ইত্যাদিকে অণুজীবসৃষ্ট মহামারির কারণ হিসেবে কল্পনা করা হতো। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশের মানুষ কলেরার কারণ হিসেবে কাল্পনিক ‘ওলা বিবি’কেই চিহ্নিত করতো, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে যার উল্লেখ আমরা পাই। মানুষ কারণ সম্পর্কে জানুক আর না জানুক, ইতিহাসে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবসৃষ্ট মহামারির প্রভাবে সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, পাল্টে গেছে আমাদের সমাজ সংগঠন ও অর্থনীতির চিত্র। কিন্তু বাঙালি সব সংকট ঠিকই কাটিয়ে উঠেছে।

এখন পর্যন্ত বাঙালি ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল হয়েই সব সংকট জয় করেছে কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস এখন ঐক্যের বিপরীতে সঙ্গনিরোধের কথা বলছে। কী জিনিস এই সঙ্গনিরোধ? সঙ্গনিরোধের ইংরেজি ছঁধৎধহঃরহব। বলা হচ্ছে বালাই অথবা রোগ বিস্তার কে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে দ্রব্যাদি এবং মানুষের মুক্তভাবে চলাচলের উপর আরোপিত বিধিনিষেধই এই সঙ্গনিরোধ। যদি কারো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে এবং নিশ্চিতভাবে তাকে মেডিক্যাল ডায়গনোসিস করার সুযোগ না থাকে, তখন রোগ এবং অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি তাকে বা তাদেরকে সঙ্গনিরোধ অবস্থায় রাখা হয়। সঙ্গনিরোধ মেডিক্যাল পৃথকীকরণের সমার্থক শব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সুস্থ জনগোষ্ঠী থেকে আক্রান্ত এবং সংক্রমিত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে রাখার নামই পৃথকীকরণ। সঙ্গনিরোধ কে কর্ডন স্যানিটায়ার এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই দুইটি শব্দপুঞ্জই একে অপরের কাছাকাছি; তবে কর্ডন স্যানিটায়ার বলতে সুনির্দিষ্টভাবে বুঝানো হয়; সংক্রমণজনিত রোগ ছড়ানো আটকে দেওয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার মানুষজনের চলাচলকে বাধা দেওয়া। কিন্তু আমরা আসলে এই সঙ্গনিরোধ বা হোম করেন্টাইনের জন্য কতটা প্রস্তুত? সংক্রামক ব্যধির কোয়ারেন্টাইন কি জিনিস তা আমাদের সকলেরই বুঝতে হবে। সংক্রমণ রোধে যেখানে এই হোম করেন্টাইন গড়ে তোলা হবে সেখানে কিন্তু সবধরনের আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোয়ারেন্টাইন হবে সম্পূর্ণরূডে ডাস্ট-ফ্রি। প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা রুম এবং আলাদা বাথরুম লাগবে। এই যে হোম কোয়ারেন্টাইনের সম্পর্কে একটা ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা কিন্তু অনেকের কাছেই পরিস্কার নয় অথচ এটা একদম স্বচ্ছ ধোঁয়া। এই ধোঁয়া করোনার মতোই প্রথম ছোঁয়ায় নাও বুঝতে পারেন। বুঝবেন কেবল চোখে ঝাঁঝটা বেশি করে লাগলে। আচ্ছা বলুন দেখি, এমন কোন বাঙালি মা আছেন, যিনি তার সন্তানকে অসুস্থ দেখলে তার কাছে যাবেন না, মাথায় হাত বুলাবেন না, পিপাসায় অসুস্থ সন্তানকে পানি এগিয়ে দেবেন না? ঐ মায়ের কি বিশেষায়িত নার্সিং প্রশিক্ষণ আছে? একজন বাবা হিসেবে ভাবুনতো আপনার অসুস্থ শিশুটিকে আপনি আইসোলেট করে দিতে পারবেন কি-না? আইসোলেট মানে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একটি আলাদা রুমে পুরোদস্তর বন্দী করে রাখতে হবে। চোখ ঢাকা চশমা, পুরো মুখাবয়ব ঢাকা মাস্ক এবং বায়োসেফটি গাউন পরে তার কাছে যেতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীকেও এই পোশাকে ঢাকতে হতে পারে। পুরো শরীর আবৃত না থাকলে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস এলাকার কাছেও ঘেষা যাবে না। খাবার-দাবার এবং রোগীর (কিংবা সম্ভাব্য রোগীর) প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অনেকটা দূর থেকে ঠেলে দিতে হবে। কিছু স্পর্শ করা যাবেনা -হাত ধোয়ার আগে নিজের চোখমুখ পর্যন্ত স্পর্শ করা যাবেন না। কারও সঙ্গে হাত মেলানো নয়, শিশুদের আদর করা নয়। আমার মাস্ক অন্য কেউ ছোঁবেনা, স্টেরিলাইজ নিশ্চিত না হলে ব্যবহৃত মাস্ক কোথাও রাখাও যাবেনা। ভুল করে কোথাও রাখলে সেই স্থানটিও সেনিটাইজার (টক, ডিটারজেন্ট, স্পিরিট বা এলকোহল যুক্ত পানি,) দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

এবার আসুন, বাসায় কোয়ারেন্টাইন বানিয়ে এরকম সতর্কতা কি সম্ভব? আপনি না হয় সতর্ক হলেন। আপনার বাসার মধ্যে থুপথাপ করে হেটে বেড়ানো দুই বছরের শিশুটিকে কিভাবে সতর্ক করবেন? ঐ বাবুটি যে অসুস্থ মায়ের, বাবার বা দাদা-দিদিমার বিছানায় উঠে পরবে! আপনার গ্রামের বাড়িতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা এটাচড বাথরুম আছে? কোয়ারেন্টাইনের রোগীকে কোন বাথরুম ব্যবহার করতে দেবেন? মোদ্দা কথা হলো, সম্পূর্ণ মেডিকেটেড ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোয়ারেন্টাইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। শুধু মেডিকেটেড আয়োজন নয়- অতিমাত্রায় কঠোরতা আরোপ ছাড়া মেডিকেটেড অবকাঠামোর মধ্যেও এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই কঠোরতা হয়তো নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পরবে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। কারণ মায়ের আবেগ দিয়ে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আবেগ প্রশ্রয় দিলে মাকেও বাঁচানো সম্ভব নয়। ছেলে মারা গেছে বলে লাশের উপর উথালি-পাথালি কান্নার সুযোগ দেয়া যাবেনা। প্রচলিত পদ্ধতিতে লাশ গোসল দেওয়াও হয়তো সম্ভব হবেনা। বাস্তবতা মানতে হবে। চরম কষ্ট বুকে চেপে চোখের জলকে পাথর বানাতে হবে। কারণ মানুষকে বাঁচাতে হবে। দুর্যোগের প্রস্তুতি এরকমই হওয়া উচিত। মনে করুন আপনি যুদ্ধের মধ্যে আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশ এবং মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার উপর। দেশ এবং মানুষকে প্রচন্ড ভালবেসেই আপনাকে নিষ্ঠুর হতে হবে। একাধারে একজন সৈনিকের ভালবাসা এবং সৈনিকের মত অকাতর নিষ্ঠুরতা কিছু কিছু সময় আসে যখন এরকম প্রস্তুতি নিতে হয়। আমাদের সামনের সময়টা সেরকমই হতে পারে।
চীন যে করোনা নিয়ন্ত্রণে বেশি সাফল্য পেয়েছে, তার প্রধান কারণ এই কঠোরতা। সেখানেও এই রোগ যতদূর ছড়িয়েছে তার পুরোটাই ছড়িয়েছে কঠোরতার ফাকফোকর গলে। যত বেশি সাবধানতা হবেন, এই ভাইরাসের হাত থেকে তত বেশি নিরাপদ হবেন। পাশাপাশি সেখানকার ডাক্তার নার্সরা তাদের রোগীদের সেবাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদেরকেও দেওয়া হয়েছিল সবোর্চ্চ নিরাপত্তা আর এখন দেওয়া হচ্ছে বীরের মর্যদা। অথচ আমাদের দেশে যেসব ডাক্তার এবং নার্সরা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে সেবা দেবেন বা দিচ্ছেন তাদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বায়োসেফটি গাউনও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তারা অরক্ষিত অবস্থায় রোগী বা সম্ভাব্য রোগীদের কাছে যাবেন কি? আচ্ছা ধরেন এতো অরক্ষিত অবস্থায় না যাওয়া কি খুব দোষের কিছু হবে? কি একটা তামাসা! এক্ষেত্রে অনেক সময় ডাক্তার এবং নার্সদেরও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। ইতমধ্যে ঢাকা মেডিকেলের চারজন ডাক্তারকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এজন্য তাদের ভিন্ন বাসস্থান দরকার। নইলে তাদের পরিবার এবং পরিচিতজনরাও আক্রান্ত হতে পারে। তার জন্য কি ব্যবস্থা হয়েছে? তবুও আমাদের দেশের ডাক্তারা হাজারো সীমাবদ্ধতার ভিতরেও হাসিমুখে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এটাই বাঙালীর বড় শক্তির জায়গা। করোনাভাইরাস পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বর্তমান সময়ে আমাদের মাথার ওপর ভর করে আছে এক পাহাড়সমান সঙ্কট। আমাদের মনে রাখতে হবে মহামারি প্রতিরোধে শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ করলেই চলে না, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এই মহামারি ঠেকাতে উপযুক্ত উদ্যোগ নিতে হয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হয়, রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দিতে হয়। এক্সপার্টদের জ্ঞানকে মাঠপর্যায়ে কাজে লাগাতে হয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে লড়াই করতে হয় মহামারির বিরুদ্ধে। পাশাপাশি আতঙ্ক না ছড়িয়ে করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণের সম্ভাবনা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা, প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে এই সম্ভাব্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কী ভূমিকা থাকতে পারে সেই বিষয়ে ব্যাপক প্রচার করা দরকার। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি না করে মহামারি মোকাবিলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমাদের অনগ্রসর মনোভাব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পেশাদারিত্ব ও মহানুভবতার অভাবেই এ দেশ তার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি এখনো অর্জন করতে পারে নি। কিন্তু আশাহত হলে চলবে না। জীবনের এই কঠিনতম মুহূর্তে যারা তাদের আশার সাথে আপোষ করে না তারাই বিজয়ী। আমরা আশা রাখছি এই সংকট মোকাবেলায় আমরা বিজয়ী হব।

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button
error: Content is protected !!