উপজেলাধুনট উপজেলাসারিয়াকান্দি উপজেলাসোনাতলা উপজেলা

প্রতিদিন পানি বাড়ছে, বগুড়ায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী

বছরের অন্য সময়গুলো যমুনার সাথে হেসে খেলে কাটালেও প্রতি বছর বর্ষার শুরুতেই বগুড়ার যমুনা তীরবর্তী এলাকার মানুষগুলোর বুক কাঁপতে শুরু করে। কারণ প্রতি বছরই বন্যায় এই এলাকার মানুষগুলোর জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। এক সময় যমুনা তাদের যেমন দিয়েছে, তেমনি কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু। নদীপাড়ের মানুষগুলোর এক সময় জমি, বাড়িঘর, মজবুত পালঙ্ক সব ছিল। কিন্তু যমুনার করাল গ্রাসে তাদের সবকিছু জলে ভেসে গেছে। তারপর থেকেই দুঃখ-কষ্টকে নিত্য সঙ্গী করে তারা দিনমান জীবন করছেন।

প্রতি বছর বর্ষার শুরু থেকেই চরাঞ্চলের মানুষগুলো চরের মধ্যে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা বাড়ি ঘর গবাদিপশু নিয়ে ছোটেন নিরাপদ আশ্রয়ে। তারপর বর্ষার ভরা মৌসুমে যমুনার পানি বাড়ার সাথে সাথে এই মানুষগুলোও তাদের দুর্দশার নতুন রূপের সাথে পরিচিত হন।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর গত কদিনের ভারী বর্ষণে এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহতভাবে বগুড়ার যমুনায় পানি বাড়তে শুরু করে।

গত শনিবার থেকে যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তারপর আর পানিবৃদ্ধি থামেনি। হু হু করে যমুনায় পানি বেড়েই চলেছে। ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

বুধবার ১৭ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যমুনার পানি বিপৎসীমার ১১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ নিয়ে চলছে হাহাকার। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা অতি সামান্য। যেখানে সরকারি হিসেবেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা হলো ২০ হাজার। আর ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে মাত্র দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৩২২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনকে অতিরিক্ত ত্রাণ বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তিন উপজেলার মধ্যে অতি বন্যাপ্রবণ এলাকা হলো সারিয়াকান্দি উপজেলা। এ উপজেলার কাজলা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল, চালুয়াবাড়ী, চন্দনবাইশা, হাটশেরপুর, কুতুবপুর, সারিয়াকান্দি সদর, কামালপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও যমুনার তীরবর্তী এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

Bogura Live


এদিকে সোনাতলা উপজেলার পাকুল্যা, তেকানী চুকাইনগর, মধুপুর ইউনিয়ন। এছাড়া ধুনট উপজেলার সহড়াবাড়ী, বৈশাখীর চর, রাধানগর, বথুয়ারভিটা, শিমুলবাড়ী, পুকুড়িয়া ইউনিয়নসহ আরো বেশকিছু ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ১০২টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজার ২৫ পরিবারের ৮২ হাজার ৩৮০ জন মানুষ। বন্যায় আক্রান্ত এই পরিবারগুলোর মধ্যে দুই হাজার পরিবার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে আর ৪৯ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ স্থানে। ৮ হাজার ৯৭৮ হেক্টর ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। যেগুলোতে কৃষকের আউশ, পাট, রোপা আমন, বীজতলা, শাকসবজি চাষ করা ছিল। তিন উপজেলার ৬৪টি প্রাথমিক ও ১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হওয়ায় সেখানে পাঠদান বন্ধ আছে। বন্যায় ১ হাজার ৯০০টি টয়লেট, দুই হাজার ৪৫৭টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বন্যার পানিতে শুধুমাত্র সারিয়কান্দি উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ২২২টি পুকুরের (২৫.২৯ হেক্টর) ৭৩.৯৭ মে. টন মাছ ভেসে গেছে। যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সরকারি হিসেবে উল্লেখিত পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানানো হলেও বেসরকারি হিসাবে তা আরো বেমী বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

Bogura live


বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি মানুষগুলোর বাড়িঘর অর্ধেকের বেশি ডুবে গেছে। কেউ কেউ টিনের চালার কাছাকাছি মাচা তৈরি করে থাকার জায়গা করেছে। পাশেই আবার গবাদি পশু ও খাঁচায় মুরগি রেখেছেন। কেউ নৌকা আবার কেউ কলা গাছ কেটে ভেলা বানিয়ে সেটি নিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ জায়গাতেই শুকনো জ্বালানি নেই। খাবার জন্য বিশুদ্ধ পানিও নেই। তাই বিশুদ্ধ পানি সিলভারের কলসে নিয়ে আসার জন্য দূর-দূরান্তে নৌকা নিয়ে গিয়ে তারা পানি নিয়ে আসছেন। আবার কেউ কেউ নৌকায় করে তাদের গৃহস্থালির আসবাবপত্র এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। রান্না করার জায়গা না থাকায় লোকজন শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বাঁধে আশ্রয় নেয়ার মানুষগুলোও চরম দুর্ভোগে আছেন।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, আগামী ২৩ তারিখ সকালের মধ্যে বগুড়ার যমুনায় পানি আর না বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পর্কৃত পোস্ট

error: Content is protected !!
Close
%d bloggers like this: